ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর)। গাজা যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শাসন ও ইসরায়েলের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণের কথা থাকলেও, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘ফিলিস্তিনি’ পরিচয়ের মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিভাজন রয়েছে।
ফিলিস্তিনিরা কি ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় ‘সব ফিলিস্তিনি নয়’। মূলত ভৌগোলিক অবস্থান ও আইনি মর্যাদার ভিত্তিতে ফিলিস্তিনিরা দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত।
ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা ফিলিস্তিনি (আরব-ইসরায়েলি): তারা ভোট দিতে পারছেন। ইসরায়েলের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী প্রায় ২১ লাখ ফিলিস্তিনি বা আরব নাগরিক (যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ) ইসরায়েলের পূর্ণ নাগরিকত্ব ভোগ করেন। তাদের ভোটাধিকার রয়েছে। আজকের নির্বাচনে প্রায় ১৭ লাখ ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি নাগরিক ভোট দেওয়ার যোগ্য।
অধিকৃত অঞ্চলের ফিলিস্তিনি (গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেম): না, তারা ভোট দিতে পারছেন না। অধিকৃত পশ্চিম তীর (প্রায় ৩১ লাখ), অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা (প্রায় ২০ লাখ) এবং পূর্ব জেরুসালেমে (প্রায় ৩.৫ লাখ) বসবাসকারী প্রায় ৫৫ লাখ ফিলিস্তিনির ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো ভোটাধিকার নেই। অথচ তাদের সীমান্ত, যাতায়াত, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও সরকারের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার অজুহাতে আজ নির্বাচন দিবসে পশ্চিম তীরের সব সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।
ইসরায়েলি রাজনীতি ও নির্বাচনে ফিলিস্তিনি ভোটের প্রভাব
ইসরায়েলের সংঘাতময় ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতিতে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি বা আরব ভোটারদের প্রভাব এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনী ব্যবস্থায় সাধারণত কোনো একক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৬১টি আসন) পায় না। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোট পেতে পারে প্রায় ৫০টি আসন। সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী জোট পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন।
কোনো মূল জোটই এককভাবে ৬১ আসনের কোটা পূরণ করতে না পারায়, আরব দলগুলোর (যারা আনুমানিক ১৪ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে) ভূমিকা সরকার গঠনের মূল সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
২০২২ সালের নির্বাচনে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের ভোটদানের হার ছিল মাত্র ৫৪ শতাংশ। তবে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ব্যাপক বেড়ে ৬৪ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজা যুদ্ধ, কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং নিজেদের এলাকায় অপরাধ ও বৈষম্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে এবার ফিলিস্তিনি ভোটাররা বেশি সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মনসুর আব্বাসের দল ‘রাম’ বা বাম-আরব জোট ‘হাদাশ-তাল’ যদি ভালো আসন পায়, তবে বিরোধী দলনেতা গাদি আইজেনকট আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠন করতে পারেন। সরাসরি জোট সরকার না হলেও, বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে এই ভোট।
তবে ইসরায়েলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি নাগরিকরা আজ তাদের ভোটের মাধ্যমে নেসেটের রাজনৈতিক শক্তিসাম্য বদলে দেওয়ার সুযোগ পেলেও, অধিকৃত অঞ্চলের লাখ লাখ ফিলিস্তিনি তাদের ওপর শাসন চালানো ইসরায়েলি নীতির পরিবর্তন বা প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।

