...|...|...

বিশ্ব

ইসরায়েলে আরব-মুসলিম ভোটার এলো কোথা থেকে?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৪৯
Shares
ইসরায়েলে আরব-মুসলিম ভোটার এলো কোথা থেকে?

ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলে আরব-মুসলিম ভোটার এলো কোথা থেকে?

ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ দেশটির রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলে আরব ও মুসলিম ভোটারদের উপস্থিতি অনেকের কাছে প্রশ্ন তৈরি করে- তারা কারা, কীভাবে দেশটির নাগরিক হলেন এবং ইসরায়েলের নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকারই বা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো?

এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়টিতে। তবে এই জনগোষ্ঠীর ইতিহাস আরও পুরোনো, যা ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড, অটোমান সাম্রাজ্যের শাসন এবং ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

বর্তমান ইসরায়েল, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকাসহ বৃহত্তর ফিলিস্তিন অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে আরব জনগোষ্ঠীর বসবাস। অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনামল এবং ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সময়ও এই অঞ্চলে আরব মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতেন।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনকে পৃথক আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। এরপর ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরপরই আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়।

যুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় হিসেবে অভিহিত করেন। তবে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির মধ্যেও ফিলিস্তিনি আরবদের একটি অংশ নিজেদের বাড়িঘর ও বসতি ধরে রাখতে সক্ষম হন। তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের নাগরিক হন।

১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েলের সীমানার মধ্যে থেকে যাওয়া আরবদের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের নাগরিকত্ব লাভ করেন। তাদের বংশধররাও পরবর্তী সময়ে দেশটির নাগরিক হিসেবে বেড়ে ওঠেন।

বর্তমানে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের মধ্যে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাশাপাশি খ্রিষ্টান আরব ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষও রয়েছেন। তবে দ্রুজদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় রয়েছে; তাদের সবাইকে মুসলিম হিসেবে গণ্য করা সঠিক নয়।

ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অনেকেই নিজেদের ফিলিস্তিনি, আরব-ইসরায়েলি কিংবা ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য রয়েছে।

ইসরায়েলের নাগরিকত্ব আইন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর গড়ে ওঠা আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে তারা দেশটির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার পান।

ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার আনুমানিক এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাদের বড় অংশ মুসলিম। এই জনগোষ্ঠীর ভোট জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর আসনসংখ্যা ও সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইসরায়েলের সংসদের নাম নেসেট। দেশটির ১২০ সদস্যের সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা দলীয় তালিকায় ভোট দেন। কোনো দল বা জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন অর্জন করতে চাইলে আরব নাগরিকদের ভোট ও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসও দীর্ঘ। তারা বিভিন্ন আরব রাজনৈতিক দল, যৌথ তালিকা এবং ইহুদি-আরব সমর্থনভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন।

তবে সব আরব ভোটারের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। কেউ ফিলিস্তিনি অধিকার, বৈষম্য ও নাগরিক সমতার প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন; কেউ স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে তাদের ভোটকে একক রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

মুসলিম ভোটার মানেই কি ফিলিস্তিনের বাইরের মানুষ? না। ইসরায়েলের আরব মুসলিম ভোটারদের বড় অংশই সেই ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীর বংশধর, যারা ১৯৪৮ সালের আগে থেকেই এই অঞ্চলে বসবাস করতেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলের নাগরিক হন। তাদের উপস্থিতিকে কেবল অভিবাসনের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়।

অবশ্য পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল থেকে আসা মানুষের মধ্যেও মুসলিম নাগরিক রয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েলের আরব ভোটারদের ইতিহাস বুঝতে হলে স্থানীয় ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক বসবাস এবং ১৯৪৮ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্রেই আলোচনা করতে হবে।

ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণের হার, তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর আসনসংখ্যা এবং সরকার গঠনে সম্ভাব্য ভূমিকা প্রায়ই আলোচনায় আসে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আরব ভোটারদের উপস্থিতি রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশল ও নির্বাচনী ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে ভোটদানের হার বৃদ্ধি পেলেই কোনো নির্দিষ্ট দল লাভবান হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। ভোটের ফল নির্ভর করে ভোটারদের পছন্দ, দলগুলোর নির্বাচনী কৌশল, ভোটার উপস্থিতি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের আরব-মুসলিম ভোটাররা কোনো নতুন বা সাম্প্রতিক জনগোষ্ঠী নন। তাদের শিকড় এই অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রোথিত। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও যারা সেখানে থেকে যান এবং নাগরিকত্ব অর্জন করেন, তাদের উত্তরসূরিরাই আজ দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।