মৃত্যু প্রতিটি প্রাণীর জন্য অবধারিত সত্য। তবে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো, জীবনের শেষ মুহূর্ত যেন ইমানের সাথে অতিবাহিত হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া যায়। ইসলামে মৃত্যুর আগমুহূর্তে মানুষের আমল ও পরিণতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘শেষ আমলই গ্রহণযোগ্য।’ (ইবনে হিব্বান: ৩৪০)
অন্য একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যদি কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে (ভালো) কাজে লাগান।’ সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, কীভাবে আল্লাহ বান্দাকে ভালো কাজে লাগান? জবাবে তিনি (সা.) বলেন, ‘মৃত্যুর আগে তাকে ভালো কাজ করার তাওফিক দেন।’ (তিরমিজি: ২১৪২)
হাদিসে এমন কিছু অবস্থার কথা বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোকে উত্তম পরিণতি বা শাহাদাতের মর্যাদা লাভের সুসংবাদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব আলামতের কিছু মৃত্যুর সময় প্রকাশ পেতে পারে, আবার কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত্যুবরণ করার সাথে সম্পর্কিত। তবে মনে রাখতে হবে, চূড়ান্ত বিচার ও পরিণতি একমাত্র আল্লাহই জানেন।
১. মৃত্যুর সময় কালেমা পাঠ করা
মৃত্যুর আগে তাওহিদের কালেমা পাঠ করা উত্তম পরিণতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির শেষ কথা হবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন।’ (আবু দাউদ: ৩১১৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, জীবনের শেষ মুহূর্তে আল্লাহর একত্বের স্বীকৃতি নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
২. মৃত্যুর সময় কপাল ঘেমে যাওয়া
মৃত্যুর সময় কোনো মুমিনের কপাল ঘেমে যাওয়াকে উত্তম মৃত্যুর একটি আলামত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। (নাসাঈ: ১৮২৮)
তবে কারও মৃত্যুর সময় কপাল না ঘামলে তার পরিণতি খারাপ হবে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।
৩. জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করা
ইসলামে জুমার দিন ও রাতের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কোনো মুসলিম বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সময়ে মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করতে পারেন। (তিরমিজি: ১০৭৪)
এই বর্ণনার ভিত্তিতে জুমার দিন বা রাতে মৃত্যুবরণ করাকে উত্তম পরিণতির একটি সম্ভাব্য আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৪. শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করা
ইসলামে শাহাদাতের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাদের কাছে শহীদ কারা? সাহাবিরা বললেন, আল্লাহর পথে জীবনদানকারী ব্যক্তিই শহীদ।
তখন নবীজি (সা.) শহীদের পরিধি আরও বিস্তৃত করে জানান, আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তির পাশাপাশি মহামারি বা প্লেগে আক্রান্ত হয়ে এবং পেটের অসুখে মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্যও শহীদের মর্যাদার সুসংবাদ রয়েছে। (মুসলিম: ৪৮৩৫)
৫. কোনো কিছু ধসে পড়ে মারা যাওয়া
দুর্ঘটনায় দেয়াল বা অন্য কোনো স্থাপনা ধসে পড়ে কেউ মারা গেলে তার জন্য শাহাদাতের মর্যাদার কথা হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, তার উম্মতের কোনো ব্যক্তির ওপর দেয়াল বা অন্য কিছু ধসে পড়ে সে মারা গেলে আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন। (বোখারি: ৬৫২)
৬. গর্ভাবস্থায় বা সন্তান প্রসবের সময় নারীর মৃত্যু
গর্ভাবস্থায় কিংবা সন্তান প্রসবের সময় কোনো নারীর মৃত্যু হলে তার জন্য শাহাদাতের মর্যাদার সুসংবাদ রয়েছে।
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণনায় এমন নারীর শাহাদাতের মর্যাদা লাভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (ইবনে মাজা: ২৮০৩)
৭. বিষফোড়ার কারণে মৃত্যু
নির্দিষ্ট কিছু রোগ বা শারীরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের জন্যও ইসলামে শাহাদাতের মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। হাদিসে বিষফোড়ার কারণে মৃত্যুবরণকারীর জন্য এমন মর্যাদার উল্লেখ রয়েছে। (নাসাঈ: ১৮৪৬)
৮. আগুনে পুড়ে মৃত্যু
আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ করাও হাদিসে বর্ণিত শাহাদাতের অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি মৃত্যুর একটি।
নবীজি (সা.)-এর বর্ণনায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির জন্য শাহাদাতের মর্যাদার সুসংবাদ পাওয়া যায়। (নাসাঈ: ১৮৪৬)
৯. নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যু
নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে কেউ নিহত হলে তার জন্যও শাহাদাতের মর্যাদার কথা হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন, তিনি শহীদ। (বোখারি: ২৮৪০)
এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, অন্যায়ভাবে সম্পদ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ব্যক্তির জন্য বিশেষ মর্যাদার সুসংবাদ রয়েছে।
১০. দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হওয়া
ইসলাম ও দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে কেউ নিহত হলে তার জন্য শাহাদাতের মর্যাদার কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (নাসাঈ: ৪০৯৫)
১১. জুলুম প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যু
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং জুলুম প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত ব্যক্তির জন্যও শাহাদাতের মর্যাদার সুসংবাদ রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বর্ণনায় জুলুম প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হওয়ার কারণে শাহাদাতের মর্যাদা লাভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (নাসাঈ: ৪০৯৬)
১২. আল্লাহর পথে পাহারার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৃত্যু
আল্লাহর পথে পাহারার দায়িত্ব পালন করার বিশেষ ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ দায়িত্ব পালনকালে কেউ মারা গেলে তার জন্য কবরের আজাব থেকে সুরক্ষার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর পথে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব পালনকালে কেউ মারা গেলে আল্লাহ তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবেন। কেয়ামত পর্যন্ত তার আমলও বাড়তে থাকবে। (তিরমিজি: ১৬৬৫)
উত্তম মৃত্যু কামনা ও নেক আমলের গুরুত্ব
ইসলামে উত্তম মৃত্যু কামনা করার পাশাপাশি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সৎকাজে নিয়োজিত থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আলামতগুলো মুমিনকে নেক আমল, তাওবা ও আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি উৎসাহিত করে।
তবে এসব আলামতের কোনো একটি প্রকাশ পেলেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির জান্নাত নিশ্চিত, এমন চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে কোনো আলামত প্রকাশ না পেলেই কারও পরিণতি খারাপ হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। মানুষের অন্তরের অবস্থা, ইমান এবং চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর রয়েছে।
তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমানের ওপর অবিচল থাকা, নিয়মিত নেক আমল করা, গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম পরিণতি কামনা করা।


