কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠের শূন্য পয়েন্ট থেকে সাইকেল চালিয়ে নেপালের এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম গিরিপথ জয় করে অনন্য কীর্তি গড়েছেন রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা সাইক্লিস্ট বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। তার দাবি, তিনি প্রথম বাংলাদেশি ও প্রথম আদিবাসী সাইক্লিস্ট হিসেবে সাইকেলে এভারেস্ট অঞ্চলের কংমা লা, চো লা ও রেনজো লা পাস অতিক্রম করেছেন।
‘সী টু হিমালয়াস-এক্সপিডিশন ফর অ্যাওয়ারনেস’ শীর্ষক অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১৪ আগস্ট কক্সবাজারের জিরো পয়েন্ট থেকে স্থলপথে সাইকেল চালিয়ে নেপালের হিমালয় অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন বীর কুমার। দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছান এভারেস্ট অঞ্চলে।
অভিযানের চূড়ান্ত ধাপে ৬ অক্টোবর নেপালের স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৬ মিনিটে ৫ হাজার ৩৬০ মিটার উচ্চতার রেনজো লা পাসের চূড়ায় পৌঁছান তিনি। এর মধ্য দিয়ে এভারেস্ট অঞ্চলের তিনটি উচ্চতম পাস জয় করার চ্যালেঞ্জ সম্পন্ন করেন বীর কুমার।
এর আগে ১ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৩৩ মিনিটে ৫ হাজার ৪২০ মিটার উচ্চতার চো লা পাস এবং ২১ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৫৩ মিনিটে ৫ হাজার ৫৩৫ মিটার উচ্চতার কংমা লা পাস জয় করেন তিনি।
কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে কয়েক হাজার মিটার উচ্চতার হিমালয় পর্যন্ত পুরো পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়ে তিনটি দুর্গম গিরিপথ জয় করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং উচ্চতার সাথে খাপ খাওয়ানোসহ নানা শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে লক্ষ্যে পৌঁছান তিনি।
বীর কুমারের এই অভিযান শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এর সাথে রয়েছে পরিবেশ ও সামাজিক সচেতনতার বার্তাও। ‘প্যাডেল ফর-ডোনেট ব্লাড-ক্লাইমেট জাস্টিস’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে রক্তদানে উৎসাহিত করা এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
অভিযান শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “এই অর্জন শুধু আমার একার নয়। যারা শুরু থেকে আমাকে সহযোগিতা, সাহস, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল এই সফলতা। কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেল নিয়ে হিমালয়ের দুর্গম পাসে পৌঁছাতে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে লক্ষ্য ও আত্মবিশ্বাস আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে তরুণদের উৎসাহিত করা, রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাই ছিল এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। আমি চাই, বাংলাদেশের তরুণরা স্বপ্ন দেখুক এবং নিজেদের সামর্থ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করুক।”
অভিযানে সহযোগিতার জন্য সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বীর কুমার। পাশাপাশি শুরু থেকে যারা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা, উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও শুভকামনা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বীর কুমারের এই অর্জনে কাপ্তাই ও রাঙামাটির মানুষও গর্বিত। স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক পরিসরে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার।
কক্সবাজারের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাইকেলে যাত্রা করে নেপালের হিমালয়ে পাঁচ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার তিনটি দুর্গম গিরিপথ জয়-বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার এই অভিযাত্রা বাংলাদেশের সাইক্লিং অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একই সাথে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণদের মাঝেও তৈরি করেছে সম্ভাবনার নতুন বার্তা।


