প্রতিদিন ভোর হলে স্কুলব্যাগ কাঁধে শিশুদের নদী পার হওয়ার অপেক্ষা। কর্মজীবীরা সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে ছুটছেন নৌকার খোঁজে। কোনো বাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ রোগী বা প্রসূতি মায়ের প্রসববেদনা উঠলে শুরু হয় আতঙ্ক—নৌকা পাওয়া যাবে তো? এমনই অনিশ্চয়তা আর দুর্ভোগ যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের সরাই চণ্ডী নৌকা ঘাটপাড়ের মানুষের জীবনে।
ফুলজোড় নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন অন্তত ১৫টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। বহুবার আবেদন, স্মারকলিপি ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাস মিললেও বাস্তবে আজও নির্মাণ হয়নি বহুল প্রতীক্ষিত সেতুটি।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরাই চণ্ডী নৌকা ঘাটই এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান যোগাযোগপথ। বর্ষা মৌসুমে ছোট নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে ভরসা অস্থায়ী চাটাইয়ের সাঁকো, যা সামান্য অসাবধানতাতেই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েন জরুরি রোগী ও প্রসূতি মায়েরা। গভীর রাতে নৌকা না থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীর তীরে অপেক্ষা করতে হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক সময় সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও কম নয়। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হয়ে বিদ্যালয় ও কলেজে যেতে হয় তাদের। পরীক্ষার দিন নৌকা না পেলে বা নদীর বৈরী পরিস্থিতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন না। এতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এলাকার কৃষকরাও সেতুর অভাবের কারণে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। মাঠ থেকে উৎপাদিত সবজি, ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ফলে অনেক সময় পণ্য নষ্ট হয়ে যায় কিংবা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি সেতু শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি হতে পারে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের নতুন দ্বার। অথচ বছরের পর বছর ধরে তারা শুধু আশ্বাসই শুনে আসছেন, বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউর রহমান টাইমস টুডে কে বলেন, ‘সরাই চণ্ডী নৌকা ঘাটে ব্রিজ নির্মাণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।’
তবে এই আশ্বাস কবে বাস্তবে রূপ নেবে, সেই উত্তর জানেন না স্থানীয়রা। তাদের একটাই প্রত্যাশা—আর কোনো শিশু যেন ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে না হয়, কোনো রোগী যেন নৌকার অপেক্ষায় জীবন না হারায় এবং কৃষকের ঘামে ফলানো ফসল যেন শুধু একটি সেতুর অভাবে নষ্ট না হয়।
সরাই চণ্ডী নৌকা ঘাটে একটি স্থায়ী সেতু এখন আর শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি ১৫টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষের নিরাপদ জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উন্নত ভবিষ্যতের দাবি।


