...|...|...

বিশ্ব

আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির সাম্রাজ্য বিক্রির নেপথ্যে কী?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৪৭
Shares
আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির সাম্রাজ্য বিক্রির নেপথ্যে কী?

ছবি: সংগৃহীত

আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি অ্যালিকো ড্যাঙ্গোটে তার তেল শোধনাগার কোম্পানির একটি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করছেন। এ মাসে কোম্পানিটিকে নাইজেরিয়ার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করে মহাদেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শেয়ার বিক্রির কার্যক্রম শুরু করেছেন তিনি।

নাইজেরীয় এই বিলিয়নিয়ার তালিকাভুক্তিটিকে বলেছেন ‘পিপলস আইপিও’ বা ‘জনগণের প্রাথমিক শেয়ার ইস্যু’। তার ভাষ্য, এর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা এমন একটি ব্যবসার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন, যেটিকে অনেক নাইজেরীয় ইতোমধ্যেই জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখেন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্রির জন্য রাখা ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন শেয়ারের সবগুলো বিক্রি হলে কোম্পানিটি ২ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন নাইজেরিয়ান নাইরা বা প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করবে। এই অর্থ শোধনাগারের সম্প্রসারণে ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় সাত লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে শোধনাগারটি।

শেয়ার বিক্রির প্রথম দিনেই ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। এতে বিনিয়োগ অ্যাপগুলোও সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে। জননীতি বিশ্লেষক জামিল উবাহ বলেন, কোনো ব্যবসায়িক সম্ভাবনা নিয়ে নাইজেরীয়দের এমন উচ্ছ্বাস তিনি খুব কমই দেখেছেন।

তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, শেয়ারের দাম যেমন বাড়তে পারে, তেমনি কমেও যেতে পারে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ড. আবদুলরাজাক ইব্রাহিম ফাগে বিনিয়োগকারীদের এমন অর্থ বিনিয়োগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন, যা আগামী তিন, চার বা পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের প্রয়োজন হতে পারে।

কে এই অ্যালিকো ড্যাঙ্গোটে?

ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, ৬৯ বছর বয়সী অ্যালিকো ড্যাঙ্গোটে আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। ২০ সেপ্টেম্বর তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

দশকের পর দশক ধরে নাইজেরিয়ার সিমেন্ট, চিনি, লবণ ও সার বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। ২০২৪ সালে তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের মূল্য নাইজেরিয়ার শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির মোট মূল্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমান ছিল।

ব্যবসায়িক পরিবারে বেড়ে ওঠা ড্যাঙ্গোটে ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্কুলজীবনে মিষ্টি কিনে অন্য শিশুদের দিয়ে বিক্রি করাতেন তিনি। পরে ব্যবসা বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করে পাঁচ লাখ নাইরা ঋণ নিয়ে পণ্য বাণিজ্যের ব্যবসা শুরু করেন। ছয় মাসেরও কম সময়ে সেই ঋণ পরিশোধ করেন তিনি।

বর্তমানে তার ব্যবসার মধ্যে রয়েছে ড্যাঙ্গোটে সিমেন্ট, যা আফ্রিকার বৃহত্তম সিমেন্ট উৎপাদক এবং ড্যাঙ্গোটে তেল শোধনাগার। ২০২৪ সালে উৎপাদন শুরু করা এই শোধনাগারটি বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগারগুলোর একটি।

আমদানি প্রতিস্থাপনই মূল কৌশল

ড্যাঙ্গোটের ব্যবসায়িক কৌশলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ‘আমদানি প্রতিস্থাপন’। অর্থাৎ, যেসব পণ্য নাইজেরিয়াকে ঐতিহ্যগতভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, সেগুলো দেশেই উৎপাদনের চেষ্টা করছেন তিনি।

আফ্রিকার অনেক দেশ নিজেদের কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে না। ফলে কাঁচামাল রপ্তানির পর প্রক্রিয়াজাত পণ্য আবার বেশি দামে আমদানি করতে হয়। ড্যাঙ্গোটের যুক্তি, স্থানীয়ভাবে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন করা গেলে আমদানিনির্ভরতা ও সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন কমবে।

নাইজেরিয়া আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হলেও ড্যাঙ্গোটে শোধনাগার চালুর আগে পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে দেশটিকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হতো। বর্তমানে শোধনাগারটি নাইজেরিয়ার জ্বালানি ব্যবহারের ৭০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করছে। শেয়ার বিক্রির প্রসপেক্টাসে শোধনাগারের সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।

তবে সমালোচনাও রয়েছে। অক্সফাম ২০২৪ সালে অভিযোগ করে, নাইজেরিয়ার সিমেন্ট খাতে ড্যাঙ্গোটের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তেল খাতে তার সম্প্রসারণও নতুন বেসরকারি একচেটিয়া অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়।

ড্যাঙ্গোটে অবশ্য একচেটিয়া ব্যবসায়ী হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, অন্যরা যখন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়নি, তখন তিনি নাইজেরিয়া ও আফ্রিকার উৎপাদন খাতের সম্ভাবনা দেখে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।

সম্পদের সুফল কারা পাচ্ছেন?

ড্যাঙ্গোটের দাবি, শোধনাগারের সম্প্রসারণ আফ্রিকার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। আগস্টে বিবিসির ‘ফোকাস অন আফ্রিকা’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মহাদেশের কিছু দেশ জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এ দাবিকে অতিরঞ্জিত মনে করেন। নাইজেরিয়ার সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কিংসলে মোঘালু লিখেছেন, ড্যাঙ্গোটের সম্পদ ব্যক্তিগত এবং তা উল্লেখযোগ্য পরিসরে নাইজেরীয়দের সমৃদ্ধ করেনি। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, একজন ব্যবসায়ীর ওপর এমন দায়িত্ব কতটা বর্তায়।

ড্যাঙ্গোটের ব্যবসাগুলো পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও সমালোচিত হয়েছে। ২০২০ সালে তার সিমেন্ট শিল্পের কারণে স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগার অভিযোগে ড্যাঙ্গোটে গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরে একটি কারখানার আশপাশে বসবাসকারী মানুষের জন্য দুই লাখ ৭০ হাজার ডলারের ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ দেওয়া হয়।

সাধারণ মানুষের জন্য শেয়ার কেনার সুযোগ

ড্যাঙ্গোটে বলছেন, শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে সাধারণ নাইজেরীয়দের শোধনাগারের সাফল্যের অংশীদার করতে চান তিনি। তার ভাষায়, এর মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ আরও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

শেয়ার কেনার সর্বনিম্ন বিনিয়োগের পরিমাণ রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার ৫২৫ নাইরা বা প্রায় চার ডলার। ফলে তুলনামূলক কম অর্থ দিয়েও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

হিসাবরক্ষক ও বিনিয়োগ বিশ্লেষক ওলুওয়াসিনা ওলুওয়ালেকে বলেন, আফ্রিকার আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর ঘোষিত প্রচেষ্টাও শেয়ার বিক্রিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বাড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় শোধনাগারের পণ্যের চাহিদা বেড়েছে বলেও জানান তিনি।

এরই মধ্যে অনেকে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছেন। বিনিয়োগকারী ইসাহ সালিসু জানান, তিনি নিজের সঞ্চয় থেকে ৫০ হাজার নাইরা তুলে শেয়ারে বিনিয়োগ করেছেন। তার আশা, এই অল্প অর্থ একদিন বড় অঙ্কে পরিণত হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাও রয়েছে। ড. আবদুলরাজাক ইব্রাহিম ফাগে বলেছেন, শেয়ারের দাম কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা অর্থ হারাতে পারেন। বিশেষ করে প্রথমবারের বিনিয়োগকারীদের এমন অর্থ শেয়ারে না লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, যা কয়েক মাসের মধ্যে তাদের প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ, ড্যাঙ্গোটের শেয়ার বিক্রি একদিকে সাধারণ নাইজেরীয়দের একটি বড় ব্যবসার অংশীদার হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিনিয়োগের ঝুঁকি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, সম্পদের বণ্টন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক।