সরকারি নীরিক্ষায় আপত্তি, দুদকের অভিযানে প্রাথমিক সত্যতা প্রাপ্তি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণীত শ্বেতপত্রে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণের উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও ২০ কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রদান না করলেও উচ্চতর পদে বেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিদান দিয়েছে কমিশন।
তথ্যমতে, বিটিআরসির উপ-পরিচালক, সহকারী ও উপ-সহকারী পরিচালক ও অন্যান্য যেকোনো পদে ন্যূনতম ৮ বছর কর্মরত আছেন এমন ৩৮জন কর্মকর্তার বেতন বৃদ্ধি করে ইতিমধ্যে আলাদা আলাদা চিঠিও জারি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এই বেতন বৃদ্ধির (পুরস্কার) তালিকায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্য অভিযুক্ত ২০জনের নামও রয়েছে বলে বিটিআরসির মাসিক কার্যপত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এতে মহাপরিচালক (প্রশাসন) উল্লেখ করেন, চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬ এর অনুচ্ছেদ ৬ (১) অনুযায়ী, কোন স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ব্যতিরেকে একই পদে আট বৎসর পূর্তিতে এবং চাকরি সন্তোষজনক হওয়া সাপেক্ষে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবম বৎসরে তাহার পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হবেন। এ প্রেক্ষিতে, ৩৮ জন কর্মকর্তা উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্যতার তারিখ হতে হতে যাবতীয় প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদি বকেয়াসহ প্রাপ্য হবেন।
জানা যায়, বিতর্কিত যেসকল কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে তাদের মধ্য উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. মাইদুল ইসলাম, খালেদ ফয়সাল রহমান, মিরাজুল ইসলাম, শারমিন সুলতানা, তৌহিদুর নাহার, মো. রাইসুল ইসলাম, শামসুজ্জোহা, এস এম গোলাম সারোয়ার, এস এম তাইফুর রহমান, মাহরীন আহসান, মো. নাহিদুল হাসান, মো. মেহফুজ বিন খালেদ ও সামিরা তাবাসসুম, সিনিয়র সহকারি পরিচালক মুহাম্মদ জাকারিয়া ভূঁইয়া, তৌসিফ শাহরিয়ার ও তানজারা বিনতে আনসার, সহকারী পরিচালক কাউছার আহমেদ, ভান্ডার রক্ষক মো. মাসুদ কামাল, এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এফ এম সোয়েব শাহরিয়ার।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, ২০২০ সালে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পরিচালিত নিরীক্ষায় বিভিন্ন পদে নিয়োগ এবং পদোন্নতিতে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। ওই নিরীক্ষায় বলা হয়, বিটিআরসির ২৯ জন কর্মকর্তার নিয়োগে চাকরিবিধি, নিয়োগ পরীক্ষা ও প্রক্রিয়া কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি। দুদকের অভিযান, একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টেলিযোগাযোগ খাতের শ্বেতপত্র কমিটিও এ নিয়োগগুলোকে ‘অবৈধ’ ও ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নিয়োগ ও পদোন্নতির ওপর পরিচালিত নিরীক্ষায় ধরা পড়া অনিয়মের ওপর ২০২১ সালে প্রথম তদন্ত কমিটি গঠিত হয় এবং তাতেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে আরও দুটি কমিটি গঠন করা হয়, সেই তদন্তেও অনিয়মের প্রমাণ মেলে। ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন বিটিআরসিতে অভিযান চালিয়ে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের প্রমাণ পায়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বারবার পুরস্কৃত করে আসছে।
আরও জানা যায়, বিভিন্ন তদন্তে জুনিয়র পরামর্শকদের রাজস্ব খাতে, বয়স শিথিলতার অপব্যবহার এবং প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ বিটিআরসিকে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিলেও সেটি উপেক্ষিত হয়। পরে ১০ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে নির্দেশনায় বলা হয়, যাদের বিরুদ্ধে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত, তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু এসবের পরও বিটিআরসি ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি বর্তমান সরকারের সময়ে দুর্নীতর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের কারও কারও পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করে যা বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটিতে আটকে যায়।
এমনকি চলতি বছরের মার্চ মাসে উচ্চ আদালত রুল জারি করে বলে বিটিআরসিতে ২৯ জনের অবৈধভাবে নিয়োগের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, একই সঙ্গে তাদের পদোন্নতির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত কেন বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তাও জানতে চায়। এতদসত্ত্বেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নতুন কৌশলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করলো বিটিআরসি।
সূত্র জানায়, উপ-পরিচালক পদে কর্মরত সকলের নাম ২০২০সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদন, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটিসহ সকল প্রতিবেদনে উঠে আসে। সম্প্রতি আরেক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিটিআরসিতে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত যে আট জনের নাম উঠে আসে তাদের মধ্যে রয়েছে সিনিয়র সহকারি পরিচালক মুহাম্মদ জাকারিয়া ভূঁইয়া, তৌসিফ শাহরিয়ার, সহকারী পরিচালক কাউছার আহমেদ, ভান্ডার রক্ষক মো. মাসুদ কামাল, এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এফ এম সোয়েব শাহরিয়ার, সহকারী পরিচালক কাউছার আহমেদ, মো. মাসুদ কামাল, এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এফ এম সোয়েব শাহরিয়ার।
এদিকে, অবৈধভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বেতন তড়িঘড়ি বৃদ্ধি করা হয়েছে এমন এক সময় যে মাস হতে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হতে চলেছে। এজন্য চলতি বছরের ১জুলাই থেকেই তাদের বেতন বকেয়াসহ পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে বিটিআরসি। ফলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের দিন থেকেই এই কর্মকর্তাদের চার মাসের বকেয়া প্রাপ্তির বাড়তি সুবিধা প্রাপ্তিও নিশ্চিত করে দিয়েছে বিটিআরসি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) উপ-পরিচালক (মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা) সেলিনা পারভীন সাক্ষরিত এক আদেশও জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘বর্ণিত সুবিধা ১জুলাই, ২০২৬ হতে কার্যকর হবে। কর্মকর্তাগন বেতন নির্ধারণী সুবিধা ব্যাতিরেকে ৩০জুন ২০২৬ বা এর পূর্বে কোনো বকেয়া প্রাপ্য হবেন না’ বলেও অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে দুদিন চেষ্টা করেও বিটিআরসির সাড়া মেলেনি। এমনকি সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।
সার্বিক বিষয়গুলো অবহিত করে মন্তব্য জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব (টেলিকম) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ টাইমস টুডেকে বলেন, বেতন-ভাতাদির বিষয়গুলো বিটিআরসির অভ্যন্তরীণ, এখানে মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নেই। তবে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে বিভাগী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে কয়েকবার। তাদের বেতনবৃদ্ধির বিষয় জেনে অবাক হলাম, আবারও এ বিষয়ে ফলোআপ করা হবে।

