...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

৫১৮৭ কোটি টাকার ডিএসআইপি প্রকল্প

৪ বছরের কাজ ৮ বছরে, অগ্রগতি মাত্র ৩৭ শতাংশ

ব্যয় বাড়লেও ১৫ লাখ মানুষের স্যানিটেশন নিয়ে অনিশ্চয়তা

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:২১ | আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৯:১২
Shares
৪ বছরের কাজ ৮ বছরে, অগ্রগতি মাত্র ৩৭ শতাংশ

ছবি: এআই জেনারেটেড

রাজধানী ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বহুদিন ধরেই বেশ অগোছালো। মেগাসিটির কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের বর্জ্য ও গৃহস্থালির ময়লা অপসারণে সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক ব্যবস্থা নেই। এই সংকট দূর করতে ২০২০ সালে ঢাকা স্যানিটেশন ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট হাতে নেয় ওয়াসা। শুরুতেই বাজেট ধরা হয়েছিল প্রায় পৌনে চার হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৫ হাজার ১৮৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোয়নি।

এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে সাড়ে ছয় বছরেরও বেশি সময়। অথচ প্রকল্পের বাস্তব কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। সময় ও বাজেট বাড়ানো হলেও কাজের গতি ফেরেনি। ফলে ঢাকার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় ১৫ লাখ মানুষের উন্নত স্যানিটেশন সুবিধার স্বপ্ন দিন দিন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। টাইমস টুডের অনুসন্ধান ও ওয়াসার অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই বিষাদময় চিত্র।

সময় ও ব্যয় বাড়লেও থমকে কাজের অগ্রগতি

প্রকল্পের নথি বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্পের সূচনা হলেও কথা ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হবে পুরো কাজ। তখন প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৮৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ না শেষ হওয়ায় বাড়ানো হয় মেয়াদ ও বাজেট। প্রথম সংশোধনী এনে ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ১৮৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা এবং মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। অথচ মূল মেয়াদের পর বর্ধিত মেয়াদেরও একটা বড় অংশ চলে গেলেও ভৌত অগ্রগতি আটকে আছে ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশে। আর প্রকল্পের অর্থ খরচের হার আরও কম, মাত্র ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরেও কাজের মন্দা কাটেনি। এ বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ১০৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অথচ আগস্ট পর্যন্ত ছাড় হয়েছে মাত্র ২৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে খরচ দেখানো হয়েছে ৯ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাস্তব কাজ হয়েছে মাত্র ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং আর্থিক খরচের হার ১ শতাংশের নিচে।

যেসব কারণে থমকে আছে কাজ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত কাজের ধরন ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয়ের অভাবই এই স্থবিরতার মূল কারণ। প্রকল্পের আওতায় পাগলা এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে বড় স্যুয়ারেজের লাইন বসানো হচ্ছে। এই কাজের জন্য সিটি করপোরেশন, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি ও ট্রাফিক বিভাগের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এসব সংস্থার কাছ থেকে অনুমতি পেতে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হওয়ায় কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো পাগলা শোধনাগার চালু রেখেই নতুন করে আধুনিকায়নের কাজ চালাতে হচ্ছে, যা কারিগরিভাবে বেশ কঠিন। পাশাপাশি জমি অধিগ্রহণের আইনি ঝামেলা ও ঠিকাদারদের বিল পরিশোধে ধীরগতির কারণে মাঠে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও জনবল সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বানিয়েই হাত গুটিয়ে নিচ্ছে ওয়াসা, কিন্তু আসল সংযোগ লাইনের কাজে তাদের চরম অবহেলা। এর বড় প্রমাণ দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার। বিশাল অবকাঠামো তৈরি করা হলেও ঘরবাড়ির প্রাথমিক পাইপলাইন না থাকায় প্ল্যান্টটি বহুদিন অকার্যকর পড়ে ছিল। ডিএসআইপি প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পাগলা জোনের ১৫ লাখ মানুষকে ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে আনা। মাটির নিচের মূল পাইপ বসানোর কাজ থমকে থাকায় এটিও দাশেরকান্দির মতো অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ কাঁচা পয়োবর্জ্য খোলা ড্রেন দিয়ে সরাসরি বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে পড়ছে। শোধন ছাড়া এসব বর্জ্য ফেলায় বুড়িগঙ্গা নদী অস্তিত্ব সংকটে। একই সাথে নদীগুলোর পানি মারাত্মক দূষিত হওয়ায় সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারে পানি বিশুদ্ধ করতে অতিরিক্ত রাসায়নিক লাগছে, যা ওয়াসার পানি উৎপাদনের খরচ অনেক বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, পরিকল্পনাহীন কাজ আর জবাবদিহি না থাকায় শহরের স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আসল কাজ হলো বাসাবাড়ির লাইনের সাথে মূল পাইপলাইনের সংযোগ দেয়া। তা না করে শত শত কোটি টাকার বিল্ডিং বা প্ল্যান্ট বানালে জনগণের টাকার অপচয় ছাড়া কিছুই হবে না। ওয়াসা ও অন্যান্য সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না হলে এ প্রকল্পের সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়ে জানতে ডিএসআইপির প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সেলিম মিঞার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়া মাত্রই তিনি ফোন কেটে দেন এবং পরে আর কল ধরেননি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কে মাটির নিচে বড় আকারের পাইপ বসাতে হচ্ছে। অন্যান্য সেবা সংস্থার লাইনের সাথে মেলাতে গিয়ে কিছুটা দেরি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সহায়তায় চলা এই কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ওয়াসার এক জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শুধুমাত্র প্ল্যান্টের সুন্দর ভবন দেখা গেলেই কাজ শেষ হয় না। ঘরবাড়ির সাথে পাইপলাইনের সংযোগ নিশ্চিত না করতে পারলে ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা পানিতে যাবে।

পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যায় অপরিশোধিত বর্জ্য পড়তে থাকলে ঢাকার চারপাশের নদীগুলো স্থায়ীভাবে মারা যাবে। সমস্যা সমাধানের জন্য তারা ঢাকা ওয়াসা, পরিবেশ অধিদফতর ও দুই সিটি করপোরেশনকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দিচ্ছেন, যা প্রতিদিনের কাজ তদারকি করবে।

পরিবেশবিদ বাপ্পী সর্দার বলেন, সময় খুব কম, কিন্তু কাজের গতি একেবারেই ধীর। এভাবে চললে ২০২৮ সালের মধ্যে মানুষ এর সুবিধা পাবে কিনা সন্দেহ আছে। সব জটিলতা কাটিয়ে ঠিকাদারদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কাজের গতি না বাড়ালে বিশাল এই উন্নয়ন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। 

এদিকে প্রকল্পের ৮০ শতাংশ সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও মাত্র ৩৭ শতাংশ কাজ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একে তারা চরম অব্যবস্থাপনা বলে মনে করছেন।