সর্বজনীন পেনশন স্কিমের মতো জনবান্ধব কর্মসূচির কর্মকাণ্ডের অগ্রগতি প্রায় স্থবির, চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। নানাবিধ প্রশাসনিক উদ্যোগ ও জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলেও বাড়ছে না নতুন পেনশনারের সংখ্যা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত ২২ মাসে পেনশন স্কিমের গ্রাহক জুটেছে ৬ হাজার ২৩৭ জন। বিপরীতে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালন ব্যয় ও সমতা স্কিমের ভর্তুকিবাবদ প্রায় ১৫ কোটি টাকা সরকারের কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় পেনশন স্কিমের কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়বে না জানানো হলেও তা গ্রাহকের মধ্যে পর্যাপ্ত আস্থা জন্মাতে পারেনি। ফলে ক্রমহ্রাসমান সেই ধারা অব্যাহত আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান সরকারের সময়ও। বর্তমান অর্থনৈতিক নাজুক পরিস্থিতি, মানুষের আয় হ্রাস, কর্তৃপক্ষের ওপর গ্রাহকের আস্থা এমনকি প্রচার-প্রচারণার অভাবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না। ফলে, জীবন সায়াহ্নে আর্থিক নিরাপত্তার আশায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে। এমনকি স্কিম গ্রহীতাদের মধ্যে বেশিরভাগই মাসিক চাঁদার টাকা জমা দিচ্ছেন না, যা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যমতে, ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়। পরে পরবর্তী এক বছরে অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত পেনশনারের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই পেনশন স্কিমের কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ৩২ হাজারের অধিক পেনশনার স্কিম গ্রহণ করলেও এরপরের মাসেই তা নেমে হাজারের নিচে। সেসময় পর্যন্ত পেনশন গ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৯০ জন। কিন্তু ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২২ মাসে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২২৭ জন।
মাসওয়ারি গ্রাহক সংখ্যার তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২৭৫ জন, অক্টোবরে ২০০, নভেম্বরে ৩৮১, ডিসেম্বরে ১৫৭, জানুয়ারিতে ২২৩, ফেব্রুয়ারিতে ১১৪, মার্চে ১৫৪, এপ্রিলে ১৫৩, মে মাসে ২০৩ ও জুন মাসে ৩০০ জন গ্রাহক নতুন করে স্কিম গ্রহণ করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই মাসে ২৩১, আগস্টে ১৭২, সেপ্টেম্বরে ১৩৬৬, অক্টোবরে ২৭৯, নভেম্বরে ২১২, ডিসেম্বরে ১৬০, জানুয়ারিতে ২৪০, ফেব্রুয়ারিতে ১৪৮, মার্চে ৩২৭, এপ্রিলে ৩০৫, মে মাসে ২৫৭ ও জুন মাসে ৩৮০ জন পেনশনার স্কিম গ্রহণ করেন।
কর্তৃপক্ষের জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত পরিচালন ব্যয় ও সমতা স্কিমে ভর্তুকিবাবদ খরচ হয়েছে ৫ কোটি ৮৪ লাখ ২০ হাজারের কিছু বেশি টাকা। এবং এই সময়ে পেনশনের গ্রাহক জুটেছে ২ হাজার ১৬০ জন। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই ধরনের খরচ হয়েছে ৯ কোটি ৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা এবং এ সময়ে নতুন গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে ৪০৭৭ জন।
পেনশন কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কর্তৃক সময়ে সময়ে প্রকাশিত আয়সীমার ভিত্তিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী স্বল্প আয়ের ব্যক্তিগণ (যাদের আয়সীমা বার্ষিক অনূর্ধ্ব ৬০ হাজার টাকা) নির্দিষ্ট হারে জমা প্রদানপূর্বক এ স্কিমে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এ স্কিমে সরকার কর্তৃক সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। এই স্কিম গ্রহীতার জন্য চাঁদার পরিমাণ এক হাজার টাকা। এর মধ্যে সরকার ৫০০ টাকা ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করে।
জানা গেছে, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সাধারণের জন্য পেনশনের কর্মকাণ্ড বেগবান করার কথা উল্লেখ ছিল। ফলে পেনশন কর্তৃপক্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন স্কিমে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ ছাড়া স্কিমের চাঁদা প্রদানের জন্য ৪৫টি ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এমনকি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পেনশনার যেন স্কিমের টাকা জমা দিতে পারেন, সেই উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা চাঁদার টাকা যেন সহজে জমা দিতে পারেন, সেজন্য অ্যাপস তৈরির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান টাইমস টুডেকে বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিগত সরকারের সময় এই পেনশন স্কিমের যাত্রা শুরু হলেও জনসাধারণের মধ্যে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। তবে সরকার ইতিবাচক থাকায় প্রচার-প্রচারণা, সারাদেশে পেনশন মেলা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রতিনিধির সঙ্গে মতবিনিময়সহ নানামুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ২৮ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। আর পরিচালন ব্যয় তো খুব বেশি না। আশা করছি, দ্রুতই এই সর্বজনীন স্কিম জনগণের কাছে আস্থা অর্জন করতে পারবে, গ্রাহকের সংখ্যাও বাড়বে।

