দেশের তীব্র গ্যাস সংকট মোকাবিলায় পুরোনো ও অকার্যকর কূপ মেরামতের মাধ্যমে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের বিজিএফসিএল তত্ত্বাবধানে ৫২০ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে প্রকল্পের আওতাধীন কূপগুলোর চিত্র যেন একেকটি ভিন্ন উপাখ্যান। হবিগঞ্জ-৫ কূপে গ্যাস উৎপাদনে বাজিমাত করা হলেও বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া কাজ করায় তিতাস ১৪ নম্বর কূপটি এখন কর্তৃপক্ষের গলার কাঁটা। একদিকে হবিগঞ্জে অভাবনীয় সাফল্য মিললেও, অন্যদিকে তিতাস-১৪ কূপে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। সাম্প্রতিক পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় পরিবিক্ষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। টাইমস টুডের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দেশের জ্বালানি খাতের এই ভিন্ন চিত্র।
তথ্য বলছে, প্রকল্পের আওতায় শাহজিবাজারে অবস্থিত হবিগঞ্জ-৫ কূপে আধুনিক লগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করায় অভাবনীয় সাফল্য মিলেছে। সংস্কারের আগে যে কূপ থেকে দৈনিক মাত্র ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মিলত, ওয়ার্কওভারের পর তা দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ এমএমএসসিএফডিতে। মাত্র ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা এই কূপের নতুন গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায়, মাত্র সাত মাসের গ্যাস বিক্রি দিয়েই পুরো প্রকল্পের প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলে আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে, একই প্রকল্পের আওতায় তিতাস-১৬ কূপেও সফল ওয়ার্কওভারের মাধ্যমে দৈনিক ১৩ এমএমএসসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। তবে এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা গেছে তিতাস-১৪ কূপে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস বা পানির অবস্থান নিখুঁতভাবে যাচাই না করেই অপরিকল্পিতভাবে এই কূপের সংস্কার কাজ শুরু করা হয়েছিল। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করার পর দেখা যায়, কূপটির ভূগর্ভস্থ আধার সম্পূর্ণ শূন্য এবং চারপাশ থেকে প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করছে। বর্তমানে কূপটি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থের এক বিরাট অপচয়।
অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে অর্থ খরচে দুর্নীতির শঙ্কা
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি ৬৬ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪০.২৩ শতাংশ। এর ফলে অর্থবছরের বাকি মাত্র তিন মাসে আগের তুলনায় প্রায় তিন গুণ গতিতে অর্থ ব্যয় করতে হবে। জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, বছরের শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে বরাদ্দ শেষ করার এই প্রবণতা নতুন কেনাকাটায় অনিয়ম, নয়ছয় ও দুর্নীতির দরজা বহুগুণ প্রশস্ত করে দিতে পারে।
বুয়েটের পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তামিম কালবেলাকে বলেন, প্রযুক্তিগত লগ পরীক্ষা ছাড়া কূপের ওয়ার্কওভারে হাত দেওয়া মানেই রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়। তিতাস-১৪ এর ক্ষেত্রে যে গাফিলতি হয়েছে, দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে হুট করে তিন গুণ অর্থ খরচের যে প্রবণতা আইএমইডি রিপোর্টে উঠে এসেছে, তা পুরোপুরি দুর্নীতিবান্ধব এবং তা অবিলম্বে রোধ করা দরকার।
বিজিএফসিএলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভূগর্ভস্থ জটিলতার কারণে তিতাস-১৪ কূপের পূর্বে ধারণকৃত স্ট্রাকচারাল মডেলে কিছু ত্রুটি ছিল। কাজ শুরুর পূর্বে স্ট্যান্ডার্ড লগিং করা হলেও কূপটির নিচের স্তরে অতিরিক্ত পানির উপস্থিতি এবং গ্যাসের রিজার্ভ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে।
আমদানি জট ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সের নিজস্ব ‘বিজয়-১১’ রিগ ব্যবহার করায় ড্রিলিং বা খনন ব্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে বিদেশ থেকে আমদানি করা কিছু অতীব জরুরি যন্ত্রপাতি আন্তর্জাতিক শিপমেন্টে আটকে থাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বাখরাবাদ-৬ ও মেঘনা-১ কূপের কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
জিডিএফের বা গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড অর্থ দ্রুত ছাড় করা হলে এবং কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতাগুলো পুরোপুরি কেটে গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাকি লক্ষ্যগুলো সফলভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিতাস-১৪ কূপের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী যেকোনো কাজের আগে আরও কঠোরভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে দায়িত্বশীল আরেক কর্মকর্তা বলেন, এখানে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেই। আগামী তিন মাসের মধ্যে বাকি থাকা ফান্ড পিপিআর নীতিমালা ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা পুরোপুরি অনুসরণ করে স্বচ্ছতার সাথেই ব্যয় করা হবে।
পরিবেশগত ঝুঁকি ও শ্রমিকদের সুরক্ষা ঘাটতি
প্রতিবেদনে কাজের মান ও পরিবেশগত সুরক্ষার ক্ষেত্রেও কিছু বড় ঘাটতি নজরে এসেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ভারী কাজে নিয়োজিত বহু শ্রমিকের প্রয়োজনীয় পিপিই (পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট) বা ন্যূনতম সুরক্ষা পোশাক পরিধানের বালাই নেই। কূপের ভূগর্ভস্থ চাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত রাসায়নিক মিশ্রিত ড্রিলিং মাড বা কাদা কোনো নিয়ম না মেনে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও নিকটস্থ জলাশয় মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে।
সংকট উত্তরণে আইএমইডির ৩টি সুপারিশ
আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্যাস ও পানির প্রকৃত মজুত নিখুঁতভাবে যাচাই না করে কোনো অবস্থাতেই নতুন কোনো ওয়ার্কওভার প্রকল্প অনুমোদন করা যাবে না। আমদানি জটিলতা কমাতে চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস জট নিরসন এবং জিডিএফ তহবিলের অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা দ্রুত দূর করতে হবে। এবং প্রতি ১৫ দিন অন্তর প্রকল্পের ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতির একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চড়া মূল্যে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির চেয়ে দেশীয় কূপে অনুসন্ধান ও সংস্কারে বিনিয়োগ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। তবে এর পেছনে ত্রুটিহীন পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। বিশদ এই সমীক্ষা একটি সত্যকে পুনরায় স্পষ্ট করেছে- সঠিক তথ্য, নিখুঁত বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে হবিগঞ্জ-৫-এর মতো কূপগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বিরাট অবদান রাখতে পারে। পক্ষান্তরে, যাচাই-বাছাইহীন অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত এবং অর্থবছরের শেষে তাড়াহুড়ো করে অর্থ খরচের খেসারত দিতে হয় তিতাস-১৪-এর মতো কূপে, যেখানে জনগণের কষ্টার্জিত হাজার কোটি টাকা কোনো সুফল ছাড়াই জলে ভেসে যায়।

