...|...|...

বিশ্ব

‘বিলঙ্গিং: আ জার্নি অব লাভ’: ইতালীয় কন্যার ভারত-যাত্রা ও প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের গল্প

যোবায়ের আহমদ
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, রাত ৮:৪৩ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১১:২৪
Shares
‘বিলঙ্গিং: আ জার্নি অব লাভ’: ইতালীয় কন্যার ভারত-যাত্রা ও প্রধানমন্ত্রিত্ব প্রত্যাখ্যানের গল্প

ছবি: সংগৃহীত

কিছু জীবন উপন্যাসকেও হার মানায়। সোনিয়া গান্ধীর জীবন যেন এমনই এক গল্প- শুরুটা প্রেমে রাঙানো, মাঝপথে রক্তে রঞ্জিত, আর শেষটায় ক্ষমতার সবচেয়ে বড় প্রলোভনকে হেলায় ফিরিয়ে দেওয়ার এক বিরল সাহসিকতা। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে যে গল্প তিনি বুকের গভীরে আগলে রেখেছিলেন নীরবতার চাদরে, এবার সেই গল্পই তিনি বলতে চলেছেন নিজের কণ্ঠে, নিজের ভাষায়। ভারতীয় কংগ্রেসের প্রবীণ নেত্রী ও রাজ্যসভা সদস্য সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথা ‘বিলঙ্গিং: আ জার্নি অব লাভ’ পাঠকের হাতে পৌঁছাবে আগামী ১০ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা প্রকাশনা সংস্থা আলফ্রেড এ নফের হাত ধরে। ৫৪৪ পৃষ্ঠার এই বই নিছক একটি স্মৃতিকথা নয়- এ যেন ইতালির এক নিভৃত গ্রামের এক অচেনা কন্যার ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছানোর দীর্ঘশ্বাস-মেশানো এক মহাকাব্য।

যিনি দশকের পর দশক ক্যামেরার সামনে নিজের ভেতরের ঝড় লুকিয়ে রেখেছেন, সেই ৭৯ বছর বয়সী সোনিয়া গান্ধী এবার যেন প্রথমবারের মতো দরজা খুলে দিয়েছেন নিজের অন্তরের ঘরে। নফের মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, তার পরিবারকে নিয়ে অসংখ্যবার লেখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেসব লেখা কখনোই স্পর্শ করতে পারেনি তাদের প্রকৃত মানবিক সত্তা, দুর্বলতা কিংবা প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে থাকা সত্যিকারের কারণ। তার ভাষায়, এই বই সেই না-বলা মানবিকতার প্রতিই এক নিবেদন।

লেখাটা তার জন্য সহজ ছিল না- নিজেই স্বীকার করেছেন এই কথা। তিনি বলেন, এই লেখা যেন নিজেকে সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা- এমন সব মুহূর্ত ও স্মৃতি প্রকাশ্যে আনা, যা তিনি এতদিন গভীরভাবে হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে আগলে রেখেছিলেন। আর সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী স্বীকারোক্তিটি বোধহয় এটাই- হৃদয়ভাঙা যন্ত্রণা আর একের পর এক ক্ষতিই তাকে বাধ্য করেছিল রাজনীতির প্রকাশ্য মঞ্চে পা রাখতে, অথচ তার আগ পর্যন্ত তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আগলে রেখেছিলেন লোহার প্রাচীরের মতো দৃঢ়তায়।

গল্পটা শুরু হয় ১৯৬৫ সালে, ইংল্যান্ডের কেমব্রিজের এক শান্ত ক্যাম্পাসে। মাত্র উনিশ বছরের এক ইতালীয় ছাত্রী সোনিয়া মাইনো, ভাগ্যক্রমে দেখা পান রাজীব গান্ধীর- ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর নাতি, আর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে। কে জানত, সেই সাধারণ সাক্ষাৎ-ই একদিন লিখে ফেলবে ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়! তিন বছরের প্রেমের পর বিয়ে, আর তারপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য রূপান্তরের গল্প; যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির এক ছোট শহরের সাধারণ মেয়েটি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বইয়ে উঠে এসেছে সেই দিনগুলোর নিবিড় বিবরণ- ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে প্রথম দেখার সেই স্নায়ুচাপ, হিন্দি ভাষা রপ্ত করার লড়াই, শাড়ির ভাঁজে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, আর ভারতীয় রান্নার স্বাদে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মুহূর্তগুলো। তখন রাজীব গান্ধী একজন সাধারণ বাণিজ্যিক বিমানের পাইলট, আর দিল্লির প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেই এই দম্পতি বড় করেছেন তাদের দুই সন্তানকে- কে ভেবেছিল, নিয়তি তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ!

কিন্তু জীবন বড় নিষ্ঠুর। সোনিয়ার সাজানো সংসারে একের পর এক নেমে আসে ঝড়। ১৯৮০ সালে প্রথম আঘাত- রাজীবের ছোট ভাই ও ইন্দিরা গান্ধীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী সঞ্জয় গান্ধী মারা যান বিমান দুর্ঘটনায়। ক্ষত শুকানোর আগেই আসে দ্বিতীয় আঘাত- ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর, নয়াদিল্লির বাসভবনের বাগানে নিজেরই দুই দেহরক্ষীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান ইন্দিরা গান্ধী। মায়ের রক্তাক্ত মৃত্যুর ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার আগেই আচমকা প্রধানমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন রাজীব গান্ধী, যদিও এই পথে যাওয়ার কথা তিনি কখনো ভাবেননি।

আর তারপর আসে সবচেয়ে নিষ্ঠুর তৃতীয় আঘাত। ১৯৯১ সালের ২১ মে, তামিলনাড়ুর এক নির্বাচনী সমাবেশে এলটিটিই-র এক আত্মঘাতী বোমারুর হামলায় চিরতরে থেমে যায় রাজীব গান্ধীর জীবন। সোনিয়া লিখেছেন, এই টানা তিনটি ট্র্যাজেডিই তাকে আর নীরব থাকতে দেয়নি- বাধ্য করেছিল রাজনীতির আলো-অন্ধকারে পা রাখতে।

স্বামীর মৃত্যুর পর বছরের পর বছর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রবল চাপ প্রতিহত করে অবশেষে প্রকাশ্য রাজনীতিতে পা রাখেন সোনিয়া। এরপর ইতিহাস তাকে দেয় বিরল এক স্বীকৃতি- তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী সভাপতি।

তবে বইয়ের সবচেয়ে নাটকীয় ও আলোচিত অধ্যায় বোধহয় ২০০৪ সাল। সেবারের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস সবচেয়ে বড় দল হিসেবে জয়ী হয়, সোনিয়ার নেতৃত্বে গঠিত হয় সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট। গোটা দেশ তখন অপেক্ষায়- ইতালি থেকে আসা এই নারীই কি হতে চলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী? কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি সেই সর্বোচ্চ আসন প্রত্যাখ্যান করেন, সরকারের বাইরে থেকেই পরিচালনা করেন জোট, আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তুলে দেন মনমোহন সিংয়ের হাতে। এই একটি সিদ্ধান্তই টানা এক দশক ধরে দেশ শাসন করা এক সরকারের ভিত গড়ে দেয়- আর সোনিয়ার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হিসেবে বইয়ে এটি পাবে বিশেষ গুরুত্ব।

রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে, নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে সোনিয়া লিখেছেন- তিনি যেন খুঁজে পেয়েছেন এক গভীর, অদৃশ্য সুতো, যা প্রেম আর আনুগত্যের বন্ধনে বেঁধে রেখেছে তার গোটা জীবনকে। ইতালির ছোট্ট শহরের সহজ-সরল শৈশব থেকে ভারতের জটিল, বহুস্তরীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা- এই বিশাল দূরত্বই যেন বইয়ের মূল সুর, মূল হৃদস্পন্দন।

নফ ও পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউজের ভাষায়, একদা সুপরিচিত অন্তর্মুখী সোনিয়া গান্ধী এই বইয়ে অভূতপূর্ব উষ্ণতা ও আন্তরিকতায় বলেছেন তার জীবনের গল্প; যুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির শৈশব থেকে ভারতে টেনে আনা প্রণয়, আর এমন সব বিধ্বংসী ক্ষতির বিবরণ, যা কেবল তার নিজের ভাগ্য নয়, বদলে দিয়েছে তার দত্তক নেওয়া দেশের গতিপথও। প্রকাশকদের ভাষায়, এই মহাকাব্যিক অথচ গভীরভাবে ব্যক্তিগত বর্ণনা পাঠকদের সামনে মেলে ধরবে স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের টালমাটাল ইতিহাস, বর্তমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আর দেশের বিশাল অর্থনৈতিক-সামাজিক রূপান্তরের এক অন্তরঙ্গ দৃশ্যপট।

সব মিলিয়ে বইটিকে বলা হচ্ছে একজন সাহসী নারীর নিজের জীবন নতুন করে গড়ে তোলা আর নিজের দেশের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার গল্প। নফের নির্বাহী সহসভাপতি ও প্রধান সম্পাদক জর্ডান পাভলিন এই স্মৃতিকথা প্রকাশ করতে পেরে নিজেকে সম্মানিত মনে করছেন বলে জানিয়েছেন- তার ভাষায়, এটি সোনিয়ার জীবন, সহনশীলতা, পরিবার আর ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল।

বইটি হার্ডকভার ও ই-বুক সংস্করণে প্রকাশ করবে নফ, অডিও সংস্করণ আসবে পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউজের হাত ধরে। যুক্তরাজ্যে বইটির প্রকাশনার দায়িত্বে থাকছে উইলিয়াম কলিন্স। প্রথম মুদ্রণেই এক লাখ কপি ছাপানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে প্রকাশনা সংস্থা- যা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, এই বই ঘিরে প্রকাশকদের প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া।

উল্লেখ্য, এটি সোনিয়া গান্ধীর প্রথম কলম ধরা নয়। এর আগে তিনি রাজীব গান্ধীর একটি চিত্রভিত্তিক জীবনী ও তার ছবি নিয়ে একটি বই প্রকাশ করেছিলেন, পাশাপাশি সম্পাদনা করেছেন ইন্দিরা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর মধ্যকার ব্যক্তিগত পত্রালাপের দুটি খণ্ডও।

আগামী নভেম্বরে বাজারে আসতে চলা এই স্মৃতিকথা এখনই আলোড়ন তুলেছে ভারতের রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক অঙ্গনে। একদিকে এটি এক মা, স্ত্রী আর পুত্রবধূর গভীর ব্যক্তিগত শোকগাথা; অন্যদিকে এটি স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও এক অমূল্য দলিল- যেখানে প্রেম আর রাজনীতি, ক্ষতি আর সাহস মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য জীবনগাথা, যা পড়তে বসলে ছেড়ে ওঠা কঠিন হবে যে কারও পক্ষেই।