...|...|...

সারাদেশ

৪৯৮ কোটি টাকার বাঁধে বিএনপি-আওয়ামী লীগ ‘সিন্ডিকেট’

বেলাল উদ্দিন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, রাত ১০:১৬
Shares
৪৯৮ কোটি টাকার বাঁধে বিএনপি-আওয়ামী লীগ ‘সিন্ডিকেট’

ছবি: টাইমস টুডে

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীতে ২৯৩ কোটি টাকার সমাপ্ত বেড়িবাঁধ প্রকল্পের রেশ ও ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই নতুন করে ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বিগত আওয়ামী সরকার। তবে নির্মাণের শুরু থেকেই নোনা বালু, নিম্নমানের সামগ্রীর নির্বিচার ব্যবহার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বলয়ের দাপটে উপকূল রক্ষা সংক্রান্ত এই মেগা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একটি স্বার্থান্বেষী বলয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে পুরো কাজের নিয়ন্ত্রণ হাতিয়ে নেওয়ায় ২০২৭ সালের জুন মেয়াদের মধ্যে এই মহাপরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।

জলবায়ু ও নৌ-প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কারিগরি মান উপেক্ষা করে সাগরের নোনা বালু দিয়ে নির্মিত বাঁধ বর্ষার প্রথম প্লাবনেই ধসে পড়বে, যার চরম খেসারত দিতে হবে অরক্ষিত বাঁশখালীবাসীকে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত অনুসন্ধানী তথ্যে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও স্থানীয় সিন্ডিকেটের হঠকারিতার কারণে গত ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কদমরসুল অংশে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে বাস্তবায়নাধীন নতুন এই প্রকল্পে খানখানাবাদ ইউনিয়ন উপকূলীয় এলাকায় ২ হাজার ৬১০ মিটার সাগরতীর সংরক্ষণ কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এর মধ্যে শুধু কদমরসুল গ্রামেই ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ ও ঢাল সংরক্ষণ কাজ পরিচালনা করছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ-এর সহযোগী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (পিডিএল)। তবে পটপরিবর্তন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ৩নং খানখানাবাদ ইউনিয়ন যুবদলের কথিত নেতা রেজাউল করিম রেজার নেতৃত্বাধীন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কোণঠাসা করে ফেলে।

অভিযোগ রয়েছে, তারা এক ধরনের জিম্মি দশা তৈরি করে বালু, শ্রমিক ও লেবার কাস্টিংসহ যাবতীয় সাব-কন্ট্রাক্ট ও মালামাল সরবরাহের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।

কদমরসুল উপকূলীয় পয়েন্টে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই চক্রের একচ্ছত্র চাপের কাছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএল নিজেদের প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রাংশ বা দক্ষ শ্রমিক ব্যবহার করতে পারছে না। কদমরসুল পয়েন্টে লেবার কাস্টিংয়ের কাজ করার জন্য স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের পুরোনো ও নিম্নমানের জরাজীর্ণ মেশিন বসিয়ে রেখেছে এবং বাইরে থেকে কোনো দক্ষ শ্রমিক বা কারিগরদের ঢুকতে দিচ্ছে না।

শুধু তা-ই নয়, সাধারণ মানুষ ও তদারকি কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিতে মধ্যরাতে ট্রলার ও ড্রেজারের সাহায্যে সাগর সংযোগস্থল থেকে সরাসরি ড্রেজিং করে অননুমোদিত লবণাক্ত বালু এনে বাঁধে ফেলা হচ্ছে।

বাঁধ নির্মাণের আন্তর্জাতিক কারিগরি আইন ও নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, উপকূলীয় বাঁধ তৈরির ক্ষেত্রে মিষ্টি পানির ধোয়া বালু বা নির্দিষ্ট গুণগত মানসম্পন্ন মালামাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক। নোনা বালু ও কাদা মিশ্রিত উপাদান ব্যবহারের ফলে বাঁধের ভেতরের স্থায়িত্ব শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

প্রশাসনের নথিপত্র ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লবণাক্ত বালুর এই অসাধু ব্যবহার নিয়ে ইতিপূর্বে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হলে গত বছরের ২৭ অক্টোবর কদমরসুল এলাকায় অভিযান চালান তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ওমর সানি আকন।

পরিবেশ ও কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সাগরের নোনা বালু ব্যবহারের প্রমাণ পেয়ে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন এবং স্তূপ করে রাখা লবণাক্ত বালু দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার আইনি নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু সেই প্রশাসনিক আইনি পদক্ষেপ ও আর্থিক জরিমানাকে তোয়াক্কা না করেই যুবদলের কথিত নেতা রেজাউল করিম রেজা ও তার অনুসারীরা পুনরায় একই কায়দায় রাতের আঁধারে নোনা বালু দিয়েই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই সিন্ডিকেটের পেছনের রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এক অদ্ভুত ক্ষমতার মেরুকরণ। রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও টেন্ডারবাজি, সাপ্লাই ব্যবসা ও চাঁদাবাজির স্বার্থে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর লোক একাট্টা হয়েছে।

কথিত যুবদল নেতা রেজাউল করিম রেজার এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় কিশোর গ্যাং লিডার কাইদুল ওয়াদুদ জিহান, ৩নং খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও খানখানাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল হক জাহেদ এবং বাঁশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও খানখানাবাদ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শিকদার। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে তারা মূল ঠিকাদারকে নিস্ক্রিয় করে রেখে নিম্নমানের সামগ্রী গ্রহণে বাধ্য করছে, যা কার্যত পুরো উপকূলের লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

উপকূলীয় এই উপজেলার দুর্যোগের ইতিহাস অত্যন্ত ট্র্যাজিক। ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে শুরু করে বিগত তিন দশকের প্রায় প্রতিটি সামুদ্রিক দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বাঁশখালী। সেই টেকসই সুরক্ষার স্থায়ী সমাধান হিসেবে ২০১৫ সালের ১ মে থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুন সময়সীমা নির্ধারণ করে ২০৯ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল বিগত আওয়ামী সরকার। পরবর্তীতে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং কাজের গতি ধীর হওয়ায় ঠিকাদারদের আপত্তির মুখে সেই প্রকল্পের বাজেট দফায় দফায় বাড়িয়ে প্রথমে ২৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ ২৯৩ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

সেই বাজেটের অধীনে ৩৪টি প্যাকেজে খানখানাবাদে ৪,৫০০ মিটার, ছনুয়ায় ৩,২০০ মিটার, সাধনপুরে ২,০৭৯ মিটার, পুকুরিয়ায় ১,২৬৯ মিটার, গণ্ডামারায় ৯০০ মিটার এবং বাহারছড়ায় ৫০০ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু তদারকির চরম অভাব ও অসাধু উপায়ে কাজ শেষ করার কারণে কয়েক বছরের ব্যবধানেই সেই ২৯৩ কোটি টাকার মেগা বাঁধের বিভিন্ন অংশে ভয়াবহ ফাটল, সিসি ব্লক ধস এবং নতুন করে মারাত্মক নদীভাঙন দেখা দেয়। আগের বাঁধের ব্যর্থতা ঢাকতে ও সার্বিক সুরক্ষায় সরকার নতুন প্রকল্পে ৬ দশমিক ৪১০ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্নির্মাণ ও ঢাল সংরক্ষণের বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। 

নতুন এই প্রকল্পে খানখানাবাদ ইউনিয়নে ২,৬১০ মিটার, বাহারছড়ায় ১,০০০ মিটার, ছনুয়ায় ২,৮০০ মিটার এবং সাধনপুরে ১,১০১ মিটার নদীর তীর সংরক্ষণ কাজ নির্ধারিত হয়। কিন্তু অতীতের অনিয়মের শিক্ষা না নিয়ে নতুন মেগা প্রকল্পেও সিন্ডিকেটের জিম্মিদশা পুরো ৪৯৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার সুফল পাওয়া নিয়ে বিশাল প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে।

বাঁশখালীর এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ প্রকল্পে লোনা বালুর অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সামুদ্রিক ও নৌ-প্রকৌশল এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের জেষ্ঠ্য নৌ-প্রকৌশলী ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী বা সমুদ্রতীরবর্তী বাঁধে নোনা বালু  ব্যবহার করা অত্যন্ত মারাত্মক কারিগরি অপরাধ। সাগরের বালুতে থাকা উচ্চমাত্রার সোডিয়াম ক্লোরাইড ও লবণ সিমেণ্টের বন্ধন তৈরি হতে দেয় না। ফলে লেবার কাস্টিং কিংবা সিসি ব্লকের ভেতরের রড ও রাসায়নিক কাঠামো খুব দ্রুত ক্ষয়ে যায়। শুকিয়ে গেলে নোনা বালু ধূলিকণায় পরিণত হয়, যা পানির সামান্য চাপে ধসে পড়ে।

সমুদ্রের জোয়ারের তোড়ে এবং বর্ষাকালে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেলে লোনা বালু দিয়ে তৈরি বাঁধ ভেতরের দিক থেকে ধসে পুরো অবকাঠামোকে তাসের ঘরের মতো বিলীন করে দেবে। তদারকি সংস্থা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এমন মারাত্মক জালিয়াতি কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে তারা মতামত দেন।

কদমরসুল এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তার আতঙ্ক। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কদমরসুল গ্রামের ১৪২ কোটি টাকার বেড়িবাঁধ নির্মাণ উপকূলবাসীর কাছে কেবল সরকারি কোনো উন্নয়ন কাজ নয়, এটি তাদের অস্তিত্ব ও জীবন-মরণের প্রশ্ন। আগের ২৯৩ কোটি টাকার বাঁধের অর্থ হরিলুট হওয়ায় তা সাগরে তলিয়ে গেছে।

এবারও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী চাঁদাবাজদের কারণে কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। তারা বাইরে থেকে ভালো সামগ্রী বা দক্ষ শ্রমিক আনতে দিচ্ছে না, নিজেরা জবরদখল করে নিম্নমানের বালু ও সামগ্রী দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে এই কথিত নেতারা উপকূলীয় এলাকার লাখো মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এবং প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে যদি এখনই এই চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ না করা হয়, তবে আসন্ন বর্ষা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে সমগ্র বাঁশখালী বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেজাউল হক রেজা বলেন, ‘মূল বিষয়টি আপনি যা শুনেছেন, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আমি পুরো ঘটনাটি খুলে বলছি। প্রথম কথা হলো, আমি একা এই মালামাল বা বালি সরবরাহ করছি না। আমাদের একটি যৌথ বা পার্টনারশিপ ব্যবসা রয়েছে, যার নাম মেসার্স থ্রি পয়েন্ট। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে আমরা পিডিএলকে বালি সরবরাহ করছি।

মেসার্স থ্রি পয়েন্টে মোট তিনজন অংশীদার রয়েছেন। তারা হলেন, প্যানেল চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম শিকদার, আরিফুর রহমান চৌধুরী এবং আমি রেজাউল হক রেজা।

ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালি খালাস করতে হলে ৬ ইঞ্চি পাইপের চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে হয়। আর ওই পানি অবশ্যই মিষ্টি পানি হতে হয়। লবণ পানি ব্যবহার করলে বালির গুণগত মান নষ্ট হবে—এটি আমরাও জানি।
আমরা মিষ্টি পানির ব্যবস্থা কীভাবে করেছি, সেটিও বলছি। আমাদের পার্টনার আরিফুর রহমান চৌধুরীর নিজস্ব পুকুর থেকে ৪ ইঞ্চি পাইপের মাধ্যমে মিষ্টি পানি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পিডিএল কোম্পানির ডিপ টিউবওয়েল থেকে ৩ ইঞ্চি পাইপের মাধ্যমে পানি নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ৪ ইঞ্চি ও ৩ ইঞ্চি, মোট ৭ ইঞ্চি মিষ্টি পানির সরবরাহ আমরা প্রস্তুত রেখেছি, যেখানে ৬ ইঞ্চি পানি হলেই আমাদের কাজ চলে যায়। তাই মেসার্স থ্রি পয়েন্টের পক্ষ থেকে লবণ পানি ব্যবহারের প্রশ্নই আসে না।

আসল ঘটনা হলো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। আমাদের থ্রি পয়েন্টের পার্টনার আরিফুর রহমান চৌধুরী আমাদের না জানিয়ে গোপনে কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী জামায়াত ও আওয়ামী লীগ নেতার সাথে নিয়ে দুটি নতুন আলাদা গ্রুপ তৈরি করেছেন। এর মধ্যে একটি ‘খান ট্রেডার্স’ এবং অন্যটি ‘আজমিরী এন্টারপ্রাইজ’। তাদের সাথে আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল আলম চৌধুরী, ৩ নম্বর খানখানাবাদ ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা এহসানুল হক চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মতলব, তমিজ উদ্দিন ও আলী হোসেন রয়েছে।

তারা পিডিএল কোম্পানির কোনো অফিসিয়াল ওয়ার্ক অর্ডার বা অনুমোদন ছাড়াই জোরপূর্বক ১০০ শতাংশ সাগরের লবণ পানি ব্যবহার করে বালি আনলোড করার চেষ্টা করেছে। আমি থ্রি পয়েন্টের একজন পার্টনার হিসেবে এতে সরাসরি বাধা দিই এবং প্রতিবাদ করি। কারণ, তারা যদি লবণ পানি ব্যবহার করে বালি খালাস করে, তাহলে কোম্পানির সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং এর দায় আমাদের থ্রি পয়েন্টের ওপরও আসতে পারে।

তারা জোরপূর্বক কাজ করতে গেলে গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে এবং ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর কয়েক দফায় হাতাহাতি ও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আমাদের তিনজন সাধারণ শ্রমিক গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার পর আমরা আর চুপ থাকিনি। গত ২০ সেপ্টেম্বর রোববার আমাদের এক শ্রমিকের পক্ষ থেকে থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রশাসন বা পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখে, সেটি ভালো। তদন্ত হোক। তবে আমরা চাই, প্রকৃত সত্য যেন প্রতিবেদনে উঠে আসে। আমরা মেসার্স থ্রি পয়েন্টের পক্ষ থেকে নিয়ম মেনে মিষ্টি পানি ব্যবহার করেই কাজ করছিলাম। কিন্তু আমাদের পার্টনার আরিফুর রহমান চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল আলম চৌধুরী, ৩ নম্বর খানখানাবাদ ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা এহসানুল হক চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মতলব, তমিজ উদ্দিন ও আলী হোসেনের অবৈধ হস্তক্ষেপের কারণেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।’

একই বিষয়ে জানতে আরিফুর রহমান চৌধুরীর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই প্রসঙ্গে খানখানাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল হক জাহেদ নিজ থেকে ফোন দিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, বেড়িবাঁধের কোনো কাজের সাথে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। যারা কাজ করছেন, তারা সবাই আমার এলাকার লোকজন এবং রাজনৈতিকভাবে আমার ছোট ভাই। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি হলে বিএনপির মনোনীত বাঁশখালীর এমপি প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা ভাইয়ের নির্দেশে বিষয়টি সমাধান করে দিই। আমরা চাই, তারা সবাই মিলেমিশে কাজ করুক।

তিনি আরও বলেন, আমি এর আগে তিনবার ৩নং খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছি। ভবিষ্যতেও নির্বাচন করার ইচ্ছা রয়েছে। এ কারণে একটি পক্ষ আমার পেছনে লেগেছে এবং আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। দলের সিনিয়র নেতাদের কাছে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য তারা বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।

প্রকল্পে দেখা দেওয়া চরম বিশৃঙ্খলা, প্রভাবশালী চক্রের হস্তক্ষেপ এবং নিষিদ্ধ নোনা বালু ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাঁশখালী পওর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) প্রকৌশলী অনুপম পাল প্রথমে দাবি করেন, ‘লবণাক্ত পানি দিয়ে বালু ড্রেজিং করার বিষয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ পেয়ে আমরা কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি। তবে কাজ বন্ধের নির্দেশনার পরেও একই কায়দায় রাতের অন্ধকারে কাজ চালিয়ে যাওয়া এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের সাফাই গাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, বালু মূলত সাগর থেকে আনলোড হচ্ছে, সেখানে আনলোডিং পয়েন্টের পাশে একটি পুকুরের ডিপ আছে, সেই পুকুরের মিষ্টি পানি পাইপ দিয়ে টেনে বালু আনলোড করা হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, এটি দূর থেকে দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না, দেখতে হলে সাগরে নামতে হবে। তবে এই যুক্তির পরেই আবার তিনি বিপরীত মন্তব্য করে বলেন, আমরা অভিযোগ পাওয়ার পর বালি আনলোডের কাজ বন্ধ করে দিয়েছি এবং মিষ্টি পানি ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে কাজ না করার নির্দেশ দিয়েছি।’

কাজের এলাকায় সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করা এবং স্থানীয় লোকজনের থেকে বাধ্য হয়ে বালু-শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল এলাকার উত্তপ্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতির কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, “স্থানীয়দের কাছ থেকে সরঞ্জাম বা শ্রমিক নেওয়া নিয়মমাফিক বাধ্যবাধকতা না হলেও ওই এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত জটিল।

তারা কোনো বাইরের লোক বা ঠিকাদারের নিজস্ব জনবলকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত কয়েকদিন আগে পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট থানার ওসির সশরীরে উপস্থিতিতে দাঁড়িয়ে থেকে কাজ করাতে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ‘বাঁশখালীর অন্যান্য অংশে পাউবোর কাজ স্বাভাবিক ও শান্ত পরিবেশে চললেও খানখানাবাদ অঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই এলাকায় বালু কিংবা পাথর যেটাই নিয়ে আসা হোক না কেন, স্থানীয় দলগুলোর মধ্যে মারামারি ও ঝামেলা সৃষ্টি হয়, যা বিগত বছরগুলোতেও দেখা গেছে।’

প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্থানীয় সিন্ডিকেটের বাধার মুখোমুখি হওয়া এবং মেগা প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিডিএলের প্রতিনিধিদের সাথে। প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী সাদিকুল ইসলাম পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, ‘বাঁশখালীর মতো অতি সংবেদনশীল উপকূলে নির্দিষ্ট সময়সীমা ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে কাজ সম্পন্ন করা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য। কিন্তু কাজ শুরু করার পর থেকেই স্থানীয় কিছু অসাধু গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নানা জবরদখল ও বাধার কারণে সঠিক পরিবেশে কাজ পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাগরের প্রতিকূল পরিবেশের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কাজের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সহযোগিতা নিশ্চিত না হলে নোনা বালুমুক্ত টেকসই টেকনিক্যাল মান ধরে রেখে প্রকল্প শেষ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।’

স্থানীয় কিছু অসাধু গোষ্ঠী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিরক্তির সুরে বলেন, ‘আপনারা এসে খবর নেন। তাদের নাম আমি বলতে পারব না। নাম বললে এখানে আমার আর চাকরি করা লাগবে না। আমার জীবনের নিরাপত্তার বিষয় আছে। এসব জবরদখলকারী ব্যক্তির নাম মিডিয়ার কাছে প্রকাশ করে আমি নিজের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে চাই না। তাছাড়া, তারা যে নোনা বালি সরবরাহ করেছে, তা পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়েছে। আপনি উপজেলা প্রশাসন ও ইউএনওর সাথে যোগাযোগ করে রিপোর্ট নেন। আমার কাছে এসব প্রশ্ন করে আমাকে বিপদে ফেলিয়েন না।’

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দিন দিন সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আর তার সাথে বাঁশখালীর এই দীর্ঘ উপকূলীয় সীমান্ত এখন মারাত্মক অরক্ষিত। শত শত কোটি টাকা খরচের পর যদি নোনা বালু ও দলীয় বলয়ের পকেট ভারী করার মাধ্যমে আবারও নড়বড়ে বাঁধ তৈরি করা হয়, তবে তা হবে জাতীয় সম্পদের চরম অপচয়। উপকূলীয় বাঁশখালীকে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে এই অসাধু বলয়ের হাত থেকে মেগা প্রকল্পটিকে মুক্ত করে সেনাক্যাম্প বা উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদারকি কাঠামোর মাধ্যমে কাজ শেষ করার দাবি তুলেছেন উপকূলবাসী ও বিশেষজ্ঞরা।