দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি ফেরাতে প্রায় ৪ হাজার ৫০ কোটি টাকার একটি মেগা সেতু প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ৩৫টি উপজেলার পল্লী সড়কে ৮২টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের। কিন্তু চার বছর পার হলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই। তথ্য বলছে, কাজ এগিয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ! নকশা নেই, জমি অধিগ্রহণ হয়নি, কাজও বন্ধ। অথচ ব্যর্থতার পরও শাস্তির বদলে পুরস্কার পদোন্নতি পেয়েছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) শেখ মো. আবু জাকির সিকান্দার।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই মেগা প্রকল্পের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত অন্তত ৭৬ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কাজ হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৮২টি সেতুর মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে মাত্র ৪৬টির। ১৬টি সেতুর নকশা আলোর মুখই দেখেনি। ১৬টি সেতুর কাজ এক শতাংশও এগোয়নি আর ১২টি সেতুর নির্মাণকাজ কার্যত বন্ধ এবং ১৪টির টেন্ডার প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি। তবুও চরম ব্যর্থতার এই পুরো প্রকল্পের শুরু থেকেই প্রায় ৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিশাল বহর নিয়ে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কাজের কাজ কিছু না হলেও লুটপাটের সবচেয়ে বড় খাত ছিল পরামর্শক ফি।
আইএমইডির প্রতিবেদন বলছে, প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া ৪৭ জন পরামর্শকের মধ্যে ১৭ জন প্রকল্প এলাকায় কখনো পা-ই রাখেননি। ঢাকায় বসে এলজিইডির সদর দপ্তরে সময় কাটিয়ে তারা পকেটে পুরেছেন পারিশ্রমিকের প্রায় ১৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া, মূল প্রজেক্ট প্রোফাইলে (ডিপিপি) নকশা ও কনসালটেন্সি খাতে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু বুয়েট থেকে কেবল ভেটিং নিয়ে এলজিইডির নিজস্ব ইউনিটে নকশা বানিয়ে দায় সারা হয়েছে। এর ফলে অন্তত ৫টি সেতুতে ভয়াবহ ভার্টিক্যাল (উলম্ব) ত্রুটি এবং একাধিক সেতুতে কারিগরি গলদ দেখা দিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কাজের অবস্থাও রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। আইএমইডির সরেজমিন তদন্ত বলছে, গোমতী নদীর ওপর ৩১০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণে বালুর বদলে মাটি এবং খোয়ার বদলে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের উপকরণ। যথাযথ কিউরিং না করায় এবং রড খোলা ফেলে রাখায় তাতে জং ধরেছে। শিবগঞ্জে পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুতে সম্পূর্ণ নদী বাঁধ দিয়ে সাটারিং করার মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। ভাবনহাটি ট্রিকারখালি সড়কের সেতু নির্মাণেও চুক্তি লঙ্ঘনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। এতসব অনিয়ম ও চুক্তি লঙ্ঘনের পরও কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে একটি নোটিশ পর্যন্ত দেওয়ার বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রমাণ পায়নি আইএমইডি। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাসে পিআইসি এবং প্রতি ছয় মাসে পিএসসি সভা হওয়ার কথা থাকলেও, গত চার বছরে উভয় কমিটির মাত্র চারটি করে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে!
কোনো ফিজিবিলিটি স্টাডি বা হাইড্রোলজিক্যাল বিশ্লেষণ ছাড়াই প্রকল্প গ্রহণের অভিযোগ থাকলেও শুরু থেকেই দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. আবু জাকির সেকান্দার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি টাইমস টুডেকে বলেন, জুন পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ১৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে মাত্র তিনটি সেতুর ডিজাইন বাকি। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে কোনো ত্রুটি ছিল না। পরামর্শকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন। ঠিকাদাররা দায়সারা কাজ করছেন এমন অভিযোগও সঠিক নয়। কোথাও ত্রুটি পাওয়া গেলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তার এই সাফাইয়ের পরও আইএমইডির মূল্যায়ন অত্যন্ত স্পষ্ট। সংস্থাটি বলছে, দুর্বল পরিকল্পনা, অপর্যাপ্ত তদারকি, পরামর্শকদের দায়িত্বহীনতা এবং সময়মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতার কারণেই প্রকল্পটি লক্ষ্য থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে। হাজার কোটি টাকার এই অনিয়ম, ধীরগতি ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার দায় প্রকল্প পরিচালক কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। তার জবাবদিহি নিয়ে এখন খোদ প্রকৌশল মহলেই বড় প্রশ্ন উঠেছে।

