...|...|...

ক্যাম্পাস

কুবি শিক্ষার্থীর উদ্ভাবন

হাতের শক্তি ছাড়াই নাকের ইশারায় চলবে হুইলচেয়ার

কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৩৬
Shares
হাতের শক্তি ছাড়াই নাকের ইশারায় চলবে হুইলচেয়ার

কুবি শিক্ষার্থীর উদ্ভাবিত হুইলচেয়ার। ছবি: টাইমস টুডে

হাতের শক্তি প্রয়োগ ছাড়াই শুধু নাকের ইশারায় সামনে-পেছনে এবং ডানে-বাঁয়ে চালানো যাবে হুইলচেয়ার। মুখের নড়াচড়ায় সক্রিয় হওয়া এ স্মার্ট হুইলচেয়ারে রয়েছে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও দুর্ঘটনা এড়ানোর স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। প্রযুক্তিটি তৈরি করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ১৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী শাকিরুল ভূঁইয়া।

একজন স্বজনের চলাচলের অসুবিধা থেকেই এমন উদ্ভাবনের ভাবনা আসে শাকিরুলের। ডায়াবেটিস ও পায়ের পক্ষাঘাতের কারণে তার চাচা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারতেন না। সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও পরিবারের সদস্যদের সহায়তা নিতে হতো। কাছ থেকে চাচার এই অসহায়ত্ব এবং পরিবারের ভোগান্তি দেখে হাতের শক্তি ব্যবহার করতে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবেন তিনি।

শাকিরুল বলেন, আমার চাচা অসুস্থ ছিলেন। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি তার পা প্যারালাইজড ছিল। তিনি চলাচল করতে পারতেন না। সামান্য চলাচলের জন্যও পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে পরিবারের সদস্যদের যেমন ভোগান্তি হতো, তেমনি তিনিও অনেক কষ্ট পেতেন। বিষয়টি কাছ থেকে দেখে আমার মনে হয়েছে, এ ধরনের মানুষের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব।

মুখের ইশারায় সক্রিয়, নাকের নড়াচড়ায় নিয়ন্ত্রণ

স্মার্ট হুইলচেয়ারটি পরিচালনায় ব্যবহারকারীর হাতের প্রয়োজন হয় না। এর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষায়। ল্যাপটপের ওয়েবক্যামের মাধ্যমে সফটওয়্যারটি ব্যবহারকারীর মুখ শনাক্ত করে। মুখ হাঁ করলেই সক্রিয় হয় সিস্টেমটি। এরপর পর্দায় নাকের অবস্থান শনাক্ত করে একটি আয়তাকার বক্স তৈরি হয়।

নাক ওপরের দিকে সরালে হুইলচেয়ার সামনে, নিচের দিকে সরালে পেছনে এবং ডানে-বাঁয়ে সরালে সংশ্লিষ্ট দিকে চলে। আর নাক নির্ধারিত বক্সের ভেতরে রাখলে হুইলচেয়ারটি থেমে যায়।

শাকিরুল বলেন, আমরা এমনভাবে প্রোগ্রামটি তৈরি করেছি, যাতে ব্যবহারকারী হাতের কোনো শক্তি ছাড়াই শুধু নাকের ইশারায় হুইলচেয়ার চালাতে পারেন। মুখ হাঁ করলে সিস্টেমটি সক্রিয় হয়। এরপর নাকের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে হুইলচেয়ারটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা

চলাচলের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে হুইলচেয়ারটিতে। এতে হার্ট রেট, পালস রেট ও শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের সুবিধা রয়েছে।

নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্ত করা হয়েছে ছয়টি আল্ট্রাসনিক সেন্সর। হুইলচেয়ারের চারপাশে স্থাপন করা এসব সেন্সর চলার পথে প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করতে পারে। কোনো বস্তু ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে চলে এলে হুইলচেয়ারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যায়।

এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্ধারিত আয়তাকার বক্সের বাইরে রাখা হয়েছে একটি নিরাপত্তাসীমা বা ‘সেফটি বাউন্ডারি’। ব্যবহারকারী হঠাৎ মাথা ঘোরালে কিংবা কথা বলার সময় নাকের অবস্থান ওই সীমার বাইরে চলে গেলে হুইলচেয়ারটি থেমে যায়। এতে অনিচ্ছাকৃত নড়াচড়ার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

শাকিরুল বলেন, অনেক সময় ব্যবহারকারী হঠাৎ মাথা ঘোরাতে পারেন কিংবা কারও সাথে কথা বলতে পারেন। তখন নাকের পয়েন্ট সেফটি বাউন্ডারির বাইরে চলে গেলে চেয়ারটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাবে। একইসাথে চারপাশের ছয়টি সেন্সর কোনো প্রতিবন্ধকতা ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে শনাক্ত করলেও হুইলচেয়ারটি থামিয়ে দেবে।

ল্যাপটপের বিকল্প তৈরির পরিকল্পনা

বর্তমানে হুইলচেয়ারটি পরিচালনার জন্য ল্যাপটপের প্রয়োজন হয়। তবে পরবর্তী ধাপে এ নির্ভরতা দূর করতে চান উদ্ভাবকেরা। এ জন্য ল্যাপটপের পরিবর্তে রাস্পবেরি পাই ব্যবহার করে স্বয়ংসম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ব্যবস্থায় ক্যামেরার পাশাপাশি একটি ডিসপ্লে থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী হুইলচেয়ারের গতিবিধি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন।

শাকিরুল বলেন, অনেকের কাছে ল্যাপটপ নাও থাকতে পারে। তাই আমাদের পরবর্তী পরিকল্পনা হচ্ছে ল্যাপটপের পরিবর্তে রাস্পবেরি পাই ব্যবহার করা। এতে ক্যামেরা ও ডিসপ্লে থাকবে। ব্যবহারকারী সেখান থেকেই নিজের চলাচল ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন।

অর্থ ও গবেষণাগার সংকটে অগ্রগতি ব্যাহত

প্রযুক্তিটির উন্নয়নকাজ এগিয়ে নিতে অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং গবেষণাগারের স্বল্পতাসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে গবেষকদের। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দ পাওয়া গেলেও টেন্ডার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহে সময় লেগেছে। পর্যাপ্ত গবেষণাগার না থাকায় সুপারভাইজারের ব্যক্তিগত কক্ষেই গবেষণার কাজ চালাতে হচ্ছে।

শাকিরুল বলেন, গবেষণার ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল বাজেটের ঘাটতি ও অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরাদ্দ মিললেও টেন্ডার প্রক্রিয়ার জটিলতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেতে অনেক সময় লেগে যায়। সম্প্রতি সুপারভাইজার ও এনএসসি ফেলোশিপপ্রাপ্ত এক জ্যেষ্ঠ গবেষকের অর্থায়নে কিছু সরঞ্জাম কেনা সম্ভব হয়েছে। 

তিনি বলেন, পর্যাপ্ত ল্যাব স্পেস ও যন্ত্রপাতির অভাবে সুপারভাইজারের ব্যক্তিগত কক্ষেই গবেষণা চালাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ পৃথক ল্যাব এবং দ্রুত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা গেলে গবেষণার গতি বাড়বে। একইসাথে নতুনরাও গবেষণায় উৎসাহিত হবে।

খেলনা গাড়ির প্রোটোটাইপ থেকে বাস্তব হুইলচেয়ার

গবেষণা প্রকল্পটির সুপারভাইজার ও সিএসই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাছান জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের ‘ইন্টারেক্টিভ সিস্টেমস অ্যান্ড কম্পিউটার ভিশন’ ল্যাবে ২০২৩ সালে গবেষণাটির যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে বিভাগের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী খেলনা গাড়িতে প্রযুক্তিটির প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরে বর্তমান শিক্ষার্থী শাকিরুল ভূঁইয়া সেটি বাস্তব হুইলচেয়ারে প্রয়োগ করেন।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে খেলনা গাড়িতে প্রযুক্তিটির প্রোটোটাইপ তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শাকিরুল এটিকে বাস্তব হুইলচেয়ারে সফলভাবে প্রয়োগ করেন।