...|...|...

সারাদেশ

স্বামী হত্যার বিচার চাওয়া ফাতেমাকে কেন শিশুসহ খাটতে হলো জেল

বলরাম দাশ অনুপম, কক্সবাজার
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১০:৩০
Shares
স্বামী হত্যার বিচার চাওয়া ফাতেমাকে কেন শিশুসহ খাটতে হলো জেল

জামিন পাওয়ার পর দুই মেয়ের সাথে ফাতেমা। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকার ফাতেমা বেগম। যিনি স্বামী হত্যার মামলা করে ১৫ মাসের শিশুকে সাথে নিয়ে সাত দিন কারাবাস করার পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন গত ৭ সেপ্টেম্বর। এসময় ফাতেমার বাকী দুই মেয়েকে থাকতে হয়েছিল এতিমখানায়। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে অজানা অনেক কাহিনী। এদিকে ফাতেমার স্বামী হত্যার মামলা নিয়ে পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে তার স্বামী মুহাম্মদ কাশেমকে হত্যার ঘটনায় মামলা করেছিলেন মহেশখালী থানায়। কিন্তু ওই মামলার এক আসামির মায়ের করা একটি মামলায় নিজের ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ৭ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল ফাতেমাকে। এদিকে যে মামলায় ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানো হয় এর তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

প্রতিবেদনে যাদের সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের তিনজনের দাবি, তারা কোনো সাক্ষ্য দেননি।

জানা যায়, ফাতেমার স্বামীর নাম মুহাম্মদ কাশেম। তিনি পেশায় জেলে। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোমের কবির বাজার এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পরদিন ফাতেমা বেগম থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। 

মামলায় আসামি করা হয় ১০ জনকে। তাদের একজন মো. রাসেল। কাশেম হত্যার পর এ ঘটনার রক্তাক্ত ছবি, স্বজনদের আহাজারি ও শিশুদের কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এলাকায় ক্ষোভ তৈরি হয়। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা রাসেলের বসতবাড়িতে তখন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সাথে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাদের প্রত্যেকের দাবি, তারা এই মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি তাদের নাম সাক্ষী হিসেবে কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না।

ফাতেমার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা

কাশেম হত্যা মামলার পর থেকে ফাতেমাকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠে আসামির স্বজনদের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ২০২৫ সালের ৬ মে মহেশখালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেন বলেও জানা যায়। এরপর কাশেম হত্যা মামলার আসামি রাসেলের মা নুর জাহান বেগম ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশি দরখাস্ত করেন। 

এতে অভিযোগ করা হয়, ওই বছরের ২৪ মে সকাল আটটার দিকে কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা, তার মা, তিন ভাই, মামা, ছোট বোনসহ সাতজন রাসেলের মায়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেছেন। আদালত অভিযোগটি মহেশখালী থানাকে তদন্তের আদেশ দেন। মামলাটির তদন্ত করেন মহেশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন

তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাদীপক্ষের দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সাথে কথা বলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাদের প্রত্যেকের দাবি, তারা এই মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি তাদের নাম সাক্ষী হিসেবে কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না। 

তাদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল কাশেম হত্যার দিন এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে রাসেলের বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না বলে তারা দাবি করেন। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম, মমতাজ বেগমসহ কয়েকজনও ২৪ মে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে চাপে রাখতে ও প্রতিশোধ নিতে ফাতেমার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করা হয়েছে।

মামলাটির বাদী নুর জাহান বেগমের সাথে এ বিষয়ে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাকে এলাকায় গিয়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম দাবি করেন তিনি সাক্ষীদের সাথে কথা বলেছেন। সাক্ষীদের বক্তব্যে ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। 

তিনি বলেন, আদালতে দেওয়া অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রে বাদীর দেওয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাদের বাইরে অন্য কারও সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। মো. মোজাহেরুল ইসলাম দাবি করেন, ঘটনাটি এক বছর আগের হওয়ায় এখন তার সব তথ্য মনে নেই। নথি দেখে বলতে হবে। বর্তমানে তিনি কর্মস্থলে নেই। তিনি এখন মহেশখালীর মাতারবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত।

মহেশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) প্রতুল কুমার শীল জানান, ভাঙচুরের মামলাটির বিস্তারিত তার মনে নেই। বিষয়টি জেনে পরে জানাবেন। তিনি বলেন, সব সাক্ষীর জবানবন্দি একই ধরনের হয়ে থাকলে বিষয়টি আদালতের নজরে আসার কথা। এ বিষয়ে আদালত ব্যবস্থা নেবেন।

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল জানান, ২০২৫ সালের ২৪ মে এলাকায় কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। তবে কাশেম হত্যার পর উত্তেজিত লোকজন রাসেলের পরিবারের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিলেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন। 

শেখ কামাল জানান, নিহত কাশেম ও আসামি রাসেল আত্মীয়। সামান্য টাকার বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। মামলার তার পরিবারকে দুর্বল করতেই পাল্টা মামলাটি করা হয়েছে। সেই মামলায় ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে থাকতে হলো।