সুদানে তীব্রতর হয়ে ওঠা ড্রোন হামলায় গত কয়েক দিনে ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। চিকিৎসক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এসব হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সুদানের গৃহযুদ্ধে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ‘ইমার্জেন্সি লয়ার্স’-এর তথ্যমতে, সোমবার রাজধানী খার্তুমে ড্রোন হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে। এ ছাড়া শুক্রবার থেকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে ১৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এসব হামলার জন্য সরকারি বাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) উভয় পক্ষকেই দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও বাড়ছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি ঘটে রবিবার সন্ধ্যায় পশ্চিম করদোফান অঙ্গরাজ্যের আল-দিবাব শহরে। স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীদের বরাতে জানা গেছে, বাজার শেষে বাড়ি ফেরার জন্য একটি পরিবহনকেন্দ্রে জড়ো হয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। এ সময় সেখানে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এতে ৮০ জন নিহত হন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহত ৪৭ জনকে নিকটবর্তী আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে আরও ৩০ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আরএসএফের স্বঘোষিত প্রশাসন ‘তাসিস’ এবং ‘ইমার্জেন্সি লয়ার্স’ এ হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে।
বাঁধ ও সামরিক ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা
পূর্ব সুদানের গাদারেফ অঙ্গরাজ্যে আতবারা ও সেতিত বাঁধ লক্ষ্য করে আরএসএফের চালানো বেশ কয়েকটি ড্রোন হামলা প্রতিহত করা হয়েছে বলে রবিবার সামরিক বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে। বাঁধ দুটি রাজধানী খার্তুম থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এ বিষয়ে আরএসএফের তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সোমবার ভোরে দক্ষিণ দারফুরের রাজধানী নিয়ালায় আরএসএফের একটি ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা হয়। চিকিৎসা সূত্র ও আরএসএফের তথ্য অনুযায়ী, এতে সাতজন আরএসএফ কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া শুক্রবার ইথিওপিয়া সীমান্তের কাছে ব্লু নাইল প্রদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি জমায়েতে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ৪১ জন নিহত হন বলে জানিয়েছে ‘ইমার্জেন্সি লয়ার্স’। সংগঠনটি এ ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সোমবার জাতিসংঘও প্রাণঘাতী ড্রোন হামলাগুলোর নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক বলেন, “সারা দেশে অব্যাহত প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় আমরা উদ্বিগ্ন। এসব হামলায় শিশুসহ সাধারণ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং জরুরি পরিষেবাগুলো ব্যাহত হচ্ছে।”
সুদানে অন্তত ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সামরিক বাহিনীর প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান ও আরএসএফপ্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালোর মধ্যে বিরোধ থেকে বর্তমান যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। আধা-সামরিক বাহিনীকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। দাগালো ‘হেমেদতি’ নামেও পরিচিত।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার ধারণা, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতের কারণে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। চলতি বছর সুদানে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জরুরি খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন হবে। তাঁদের মধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার।
এদিকে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মানবিক যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সুদানের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। তবে চীন ও রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছে।



