...|...|...

কর্পোরেট

শূন্য থেকে ব্যবসা, সৌরশক্তিতে নতুন স্বপ্ন

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪:২১
Shares
শূন্য থেকে ব্যবসা, সৌরশক্তিতে নতুন স্বপ্ন

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকার করপোরেট অঙ্গনে তাকে অনেকে চেনেন একটা পরিচয়ে, "বিল্ডার"। তিনি কেবল ব্যবসা পরিচালনা করেন না, ব্যবসা গড়েন, প্রায়ই একদম শূন্য থেকে। মোহাম্মদ সুবাইল বিন আলম নিজেকে পরিচয় দেন "ইঞ্জিনিয়ার-ইকোনমিস্ট" হিসেবে, আর তার প্রায় দুই দশকের কর্মজীবনটাই যেন একটা কথার বিরুদ্ধে নিরন্তর জবাব: "এখানে ওসব হবে না।"

সম্প্রতি সেই জবাবের একটা স্বীকৃতি এসেছে। ২০২৬ সালের ESG Excellence Awards Bangladesh-এ 'Excellence in Championing Climate Action' বিভাগে ব্যক্তিগত পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। একই আসরে তার প্রতিষ্ঠান র‍্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড (RIEL) পেয়েছে 'Excellence in Implementing Circular Economy' বিভাগে জুরি স্পেশাল অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কার দুটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে জাতিসংঘের গ্লোবাল কম্প্যাক্টের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার UN Global Compact Network Bangladesh এবং ESG Institute Bangladesh।

প্রকৌশল দিয়ে শুরু, একের পর এক "প্রথম"

সুবাইলের গল্পের শুরুটা প্রকৌশল দিয়ে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ। এখন জেনেভার সুইস স্কুল অব বিজনেস ম্যানেজমেন্ট থেকে করছেন ডিবিএ, সেই সঙ্গে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার PMP প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু তার আসল পরিচয় তৈরি হয়েছে মাঠে।

শুরুর দিকেই তিনি গড়ে তোলেন ঢাকার প্রথম গ্যাস-চালিত সিএনজি স্টেশন। এরপর ২০০৯ সালে যোগ দেন রহিমআফরোজ রিনিউয়েবল এনার্জিতে, আর সেখানেই যেন খুঁজে পান নিজের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। তার হাত ধরে বাংলাদেশ সচিবালয় ভবনে বাস্তবায়িত হয় দেশের প্রথম আইপিপি সৌর প্রকল্প। দাঁড় করান সে-সময়ের পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অফ-গ্রিড সৌর প্রকল্পগুলোর একটি,। এমনকি পাকিস্তানে সৌর প্যানেল রপ্তানির মধ্য দিয়ে রহিমআফরোজের প্রথম নবায়নযোগ্য জ্বালানি রপ্তানির নেতৃত্বও ছিল তারই।

শূন্য থেকে প্রতিষ্ঠান গড়ার কারিগর

তার ক্যারিয়ারের প্যাটার্নটাই যেন এমন, যেখানে গেছেন, সেখানেই প্রথম কিছু গড়েছেন।

২০১৫ সালে বেলজিয়ামের বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান সারেন্স যখন বাংলাদেশে আসে, তার নেতৃত্বে ছিলেন সুবাইল। তখন দেশে কোনো ইউরোপীয় হেভি-লিফট কোম্পানির অস্তিত্বই ছিল না, আইনি কাঠামো, কর-ভ্যাট, এইচআর নীতি, কিছুই না। সবকিছু শূন্য থেকে দাঁড় করিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সারেন্স বাংলাদেশ, গ্রুপের ৬৫তম বৈশ্বিক ইউনিট এবং দেশে নিবন্ধিত প্রথম ইউরোপীয় হেভি-লিফট কোম্পানি। রূপপুর, মাতারবাড়ী, মেঘনাঘাটের মতো প্রকল্পে প্রথমবারের মতো ৬০০ টন ক্ষমতার ক্রেন নামে তারই তত্ত্বাবধানে। কয়েক বছরেই বার্ষিক ৩০ লাখ ডলারের বেশি চুক্তি আর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। একই সময়ে সারেন্স থাইল্যান্ডের ঘুরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে এক প্রান্তিকেই বাজার-হিস্যা ৩৫ শতাংশ বাড়ান, কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন মিয়ানমারেও।

একই গল্পের পুনরাবৃত্তি রেন্টিজ বাংলাদেশে। ২০২৩ সালে রেন্টিজ গ্রুপের প্রথম আন্তর্জাতিক ইউনিট হিসেবে এটি গড়ে তোলেন তিনি, আর প্রথম বছরেই সেটি হয়ে ওঠে গ্রুপের প্রথম লাভজনক আন্তর্জাতিক ইউনিট। ঢাকা থেকে শুরু করে পাঁচটি বিভাগে ৪০ জনের বেশি কর্মী নিয়ে অ্যাক্সেস ওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম (এডব্লিউপি) খাতে বাজার-নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ২১টি দেশে কাজের অভিজ্ঞতা, আর দীর্ঘদিন গুগল বাংলার উন্নয়নে পরামর্শকের ভূমিকা, তার কাজের পরিধিকে করেছে ব্যতিক্রমী রকমের বিস্তৃত।

দয়া নয়, লাভজনক ব্যবসা

র‍্যাংকন ইনফ্রাস্টাকচার এবং ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবে সুবাইলের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ২৬৬ শতাংশ, চালু হয়েছে প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড বিল্ডিং (পিইবি) স্থাপনের নতুন সেবা লাইন। কিন্তু এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াইটা ছিল ভেতরের, ধারণার।

একটা ম্যানুফ্যাকচারিং গ্রুপকে বোঝাতে হয়েছে, ছাদের ওপর মেগাওয়াট মাপের সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ কোনো দয়া বা কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং একটি লাভজনক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। তার যুক্তি সহজ: যে জিনিস লাভ দেয়, সেটাই ছড়িয়ে পড়ে, শুধু আবেগ দিয়ে বিপ্লব হয় না। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ব্যবসায়িক যুক্তি দাঁড় করান, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (IDCOL)-এর সঙ্গে অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করেন, আর গাজীপুরের র‍্যানকন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে ১.৩ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার রুফটপ সৌর প্রকল্প এগিয়ে নেন, যতক্ষণ না IDCOL-এর শীর্ষ কর্মকর্তা নিজে এসে প্রকাশ্যে সেটির প্রশংসা করেন।

এরপরের অর্জনটি প্রতীকীও বটে: বাংলাদেশের প্রথম সম্পূর্ণ সৌরচালিত কোল্ড স্টোরেজ।কোল্ড স্টোরেজ দেশের সবচেয়ে বিদ্যুৎ-নিবিড় শিল্পগুলোর একটি, তাই একে সৌরশক্তিতে চালানো ছিল একই সঙ্গে কঠিন আর তাৎপর্যপূর্ণ। বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: এটি যদি সম্ভব হয়, তবে আর কী সম্ভব নয়? সব মিলিয়ে র‍্যাংকনে-এর নিজস্ব সৌরকর্মসূচি এখন এগিয়ে চলেছে ৭.৫ মেগাওয়াটের দিকে।

সুবাইলের কাছে অবশ্য সংখ্যা গল্পের অর্ধেক মাত্র। গ্রামীণ পর্যায়ে RIEL-এর SHIFT প্রকল্পে সৌর-সেচ, ব্যাটারি সংরক্ষণ আর সম্প্রদায়ভিত্তিক জৈব সার উৎপাদনকে একটি চক্রাকার ব্যবস্থায় জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেখানে একটির বর্জ্য আরেকটির সম্পদ। ২০টি কৃষক পরিবার আর নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে গড়া এই মডেলেঘরে এসেছে বাড়তি আয়, সন্তানের স্কুলের খরচ, নারীর নিজের একটা সম্মান।

সিদ্ধান্তের টেবিলে প্রকৌশলী

সুবাইল মনে করেন, শুধু প্রকল্প বানালেই হয় না, মানুষের মাথার ভেতরের হিসাবটাও বদলাতে হয়। তাই তিনি কেবল প্রকৌশলী বা ব্যবসায়ী নন, একজন নিয়মিত কলাম-লেখকও। প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, ডেইলি অবজারভারসহ জাতীয় গণমাধ্যমে দেড় শতাধিক নীতিমূলক কলাম লিখেছেন তিনি। ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা, গ্রিড আধুনিকায়ন, জলবায়ু-অর্থায়ন সক্রিয় করা, এসব জটিল বিষয়কে তিনি সাধারণ পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলেন। তার লেখার মূল সুরটা একটাই: সমাধান আমাদের জানা, কিন্তু সিদ্ধান্তের টেবিলে আসল মানুষ নেই।

এই কণ্ঠই তাকে নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক নীতির টেবিলে। গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার একটি কর্মসূচিতে ইকোনমিক গ্রোথ টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট এবং ইউএসএআইডি SHIFT প্রকল্পে (ইউল্যাব) কারিগরি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ২০২৬ সালে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় কুয়েটের টেডএক্স মঞ্চে বলেছেন "Unseen Leadership and Resilience" নিয়ে, শিরোনামটা যেন তার নিজের জীবনেরই প্রতিধ্বনি, যে নেতৃত্ব ফাইলের নিচে নয়, মাঠে তৈরি হয়।

শুধু ব্যবসা ও কলমেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। সেন্টার ফর সায়েন্স, টেকনোলজি পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি (CSTPD)-এর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য, বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (BSREA)-এর পরিচালক, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (IEB)-এর সদস্য এবং ঢাকার নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পানাম ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি। সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের "৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ" কর্মসূচির পরামর্শক পুলে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু বিষয়ে কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও যুক্ত হয়েছেন।

স্বীকৃতিও এসেছে ধারাবাহিকভাবে। এবারের ESG পুরস্কারের আগে বাংলাদেশ ক্লিন এনার্জি উইক ২০২৫-এ পেয়েছেন অপারেশনাল লিডারশিপে এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড, আর IEOM সোসাইটি ইন্টারন্যাশনালের অকুপেশনাল এরগোনমিক্স অ্যাওয়ার্ড।

পর্দার আড়ালের মানুষ

পেশাগত পরিচয়ের বাইরে সুবাইল বিবাহিত, এক সন্তানের বাবা। কুড়িটির বেশি দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে করেছে আরও বৈশ্বিক। অবসরে বই পড়েন, বিশেষ টান ক্লাসিক রহস্য উপন্যাসে, আর উপভোগ করেন বিশ্ব ফুটবলের উত্তেজনা। করপোরেট নির্বাহী, কলাম-লেখক আর সমাজ-সচেতন প্রকৌশলী, এই তিন সত্তার মিশেলেই তার প্রতিকৃতি।

সামনের পথ

সুবাইলের কাছে এই পুরস্কার শেষ গন্তব্য নয়, একটা বড় লক্ষ্যের মাইলফলক। তার স্বপ্নটা র‍্যাংকনের-এর সীমানা ছাড়িয়ে: প্রমাণ করা যে বাংলাদেশে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বাণিজ্যিকভাবেই টেকসই, আর সেই মডেল যেন গোটা শিল্প খাত অনুসরণ করতে পারে। বাংলাদেশ যেন কেবল জ্বালানি আমদানিকারক নয়, টেকসই শক্তি উৎপাদনকারী দেশ হয়ে ওঠে।

 "আমি শুধু 'এখানে হবে না' কথাটা মেনে নিতে চাইনি, একবারও।" আর ঠিক সেই জেদটাই, প্রকৌশলের নিখুঁত হিসাব আর একটা বাসযোগ্য দেশের স্বপ্নের মিশেলে, আজ বাংলাদেশের পরিবেশের গল্পটাকে নতুন করে লিখছে।