বাংলাদেশের সমাজে নানা ধরনের লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কার শেকড় গেড়ে বসে আছে বহু বছর ধরে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক হাঁপানি থেকে শুরু করে যৌনক্ষমতা বাড়ায় এবং জোঁকের তেলে দূর হয় শরীরের নানা জটিল ব্যথা।
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এসব ধারণার বেশিরভাগেরই কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এ ধরনের অপবিশ্বাসের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে খেঁকশিয়াল বা পাতিশিয়াল হত্যার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। শিয়াল ধূর্ত বা ক্ষতিকর- এমন ধারণার পাশাপাশি এর মাংসের ঔষধি গুণ নিয়ে রয়েছে প্রবল লোকবিশ্বাস। সম্প্রতি বরিশালে সাতটি শিয়াল পিটিয়ে মারার ঘটনার পর স্থানীয়দের অনেকে দাবি করেন, শিয়ালের মাংস খেলে রোগ ভালো হয়।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি পুরোপুরি একটি ভ্রান্ত ধারণা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত বলেন, ‘শিয়ালের মাংস খেলে রোগ ভালো হয়- এমন দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আধুনিক ফার্মাকোলজির কোথাও এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায় না। এগুলো মূলত কুসংস্কার।
এছাড়া গবেষকদের মতে, কৃষকদের এমন ধারণা রয়েছে যে শিয়াল মুরগি খেয়ে ফেলে, অথচ গবেষণায় এর খুব একটা সত্যতা মেলেনি। আর কাঁচা বা অনিরাপদ শিয়ালের মাংস খেলে মানবদেহে মারাত্মক ক্ষতিকর জীবাণু বা বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করার বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে।
দীর্ঘদিন ধরেই তক্ষককে ঘিরে ক্যানসার বা দুরারোগ্য রোগ সারানো এবং যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির মতো মনগড়া গুজব ছড়িয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার প্রতারণা চলছে। মূলত পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ঐতিহ্যবাহী ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে এর চাহিদা থাকায় একসময় বাংলাদেশ থেকে প্রচুর তক্ষক পাচার হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, তক্ষককে নিয়ে একটি দুষ্টু চক্র দীর্ঘদিন ধরে গুজব ছড়িয়ে আসছে। তবে মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে যে তাদের বোকা বানানো হচ্ছে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিকভাবে প্রকৃতি থেকে তক্ষক সংগ্রহ করায় এর অস্তিত্ব মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
জোঁকের তেল বনাম প্রাচীন 'লিচ থেরাপি'
শিয়াল বা তক্ষকের কার্যকারিতা না থাকলেও, ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইউনানি শাস্ত্রে জোঁক দিয়ে চিকিৎসার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ইউনানি চিকিৎসায় রক্ত জমাট বাঁধা বা জয়েন্টের ব্যথায় ‘লিচ থেরাপি’ বা জোঁক দিয়ে রক্ত অপসারণের বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে।
তবে হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ স্পষ্ট করেছেন, সব জোঁক দিয়ে এই চিকিৎসা হয় না। এর জন্য নির্দিষ্ট ‘মেডিকেটেড’ বা চাষ করা জোঁক ব্যবহার করতে হয়, যা বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশুদ্ধ করা হয়।
অন্যদিকে, ফুটপাত বা হাটবাজারে যে ‘জোঁকের তেল’ বিক্রি করা হয়, তার কোনো ঔষধি গুণ নেই বলে নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত জানান, সাপের বিষ বা মাছের তেল থেকে কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিভেনম বা ওষুধ তৈরি হলেও জোঁকের তেলের কোনো চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও বাস্তব চিত্র
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী শিয়াল ও তক্ষক উভয় প্রাণীই সংরক্ষিত। ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ অনুযায়ী গবেষণা বা লাইসেন্স ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, পরিবহন বা কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের সংরক্ষণ কর্মকর্তা রথীন্দ্র কুমার বিশ্বাস জানান, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে বন বিভাগ, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ পাঁচটি সংস্থা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।




