...|...|...

অন্যান্য

এক পাখির ডাকে বদলে গেল ইকুয়েডরের ভাগ্য

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৪৭
Shares
এক পাখির ডাকে বদলে গেল ইকুয়েডরের ভাগ্য

ইকুয়েডরের বিলুপ্তি প্রায় পাখি জোকোটোকো অ্যান্টপিটা। ছবি: সংগৃহীত

আন্দিজ পর্বতমালার চূড়ায় সেদিন ভেসে ছিল এক কুয়াশাচ্ছন্ন, শীতল সকাল। পাহাড়ি বনের গভীর নীরবতা ভেঙে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন আশার আলো। মাত্র তিন দশক আগের কথা- ১৯৯৭ সালের নভেম্বরে আমেরিকান পাখিবিশারদ রবার্ট রিজলির নেতৃত্বে একদল অভিযাত্রী দক্ষিণ ইকুয়েডরের গহীন বনে অনুসন্ধানে বের হয়েছিলেন। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বনের পথ ধরে চলার সময় তারা দূর থেকে শুনতে পান এক অদ্ভুত ডাক- অনেকটা পেঁচার মতো, কিন্তু সম্পূর্ণ অচেনা। রিজলি পরবর্তীতে স্মৃতিচারণায় বলেছিলেন, ডাকটি এতটাই উদ্ভট ছিল যে তারা বুঝতেই পারছিলেন না এটা কীসের ডাক, আর সত্যি বলতে তিনি ভাবেননি এর রহস্য কখনো উন্মোচিত হবে।

দলের সামনে এগিয়ে গিয়ে রিজলি ডাকটি আরও কাছে থেকে শুনতে পান। তিনি সেই ডাক রেকর্ড করে তা আবার বাজিয়ে শোনান- আর তখনই ঘন বাঁশঝাড় ভেদ করে সোজা খোলা জায়গায় বেরিয়ে আসে রহস্যময় সেই প্রাণী। রিজলি সাথে সাথেই বুঝতে পারেন, এটি এক অসাধারণ কিছু- স্থানীয় মানুষ ছাড়া বিজ্ঞানের জগতে এর আগে কেউ কখনো দেখেনি এই পাখিকে। সাদা মুখ, বাদামি পিঠ, ধূসর বুক আর কালো মাথার এই ভূচর পাখিকে স্থানীয় কৃষকরা আগে থেকেই চিনতেন, তার উচ্চস্বরের ডাক শুনে নাম দিয়েছিলেন ‘জোকোটোকো’।

দুই বছর পর, ১৯৯৯ সালে পাখিটির আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক বিবরণ প্রকাশিত হয়- নাম দেওয়া হয় জোকোটোকো অ্যান্টপিটা, বৈজ্ঞানিক নাম ‘গ্রালারিয়া রিজলি’, যা তার গর্বিত আবিষ্কারকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাখা হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় আকারের পাখিগুলোর একটি এই জোকোটোকো অ্যান্টপিটা, যা দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের চোখ এড়িয়ে ছিল সম্ভবত তার অত্যন্ত সীমিত বিচরণক্ষেত্র অথবা শুধুমাত্র প্রজনন মৌসুমে ডাকার স্বভাবের কারণে।

কিন্তু গল্পটা শুধু একটি নতুন প্রজাতির আবিষ্কারেই থেমে থাকেনি। রিজলি দ্রুতই বুঝতে পারেন, বিলুপ্তির হাত থেকে এই পাখিকে বাঁচাতে হলে তার বনভূমির আবাসস্থল অবিলম্বে রক্ষা করা প্রয়োজন। তিনি ও তার কয়েকজন সমমনা বন্ধু মিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দাতাদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে জমি কিনতে ও পুনরুদ্ধার করতে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালে জন্ম নেয় ‘জোকোটোকো ফাউন্ডেশন’, আর সেই বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় তাদের প্রথম সংরক্ষিত এলাকা- তাপিচালাকা রিজার্ভ।

একটি নিঃসঙ্গ পাখির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সেই যাত্রা আজ পরিণত হয়েছে এক বিশাল আন্তর্জাতিক মডেলে। বর্তমানে ইকুয়েডরজুড়ে ১৯টি সংরক্ষিত এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর ভূমি রক্ষা করছে এই সংস্থা, পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে মালিকানাধীন আরও প্রায় ৮২ হাজার হেক্টর জমিও তারা পরিচালনা করছে। এই সুবিশাল সংরক্ষিত এলাকাগুলো আজ আশ্রয় দিচ্ছে ১ হাজার ৩৫০টিরও বেশি প্রজাতির পাখিকে- যা ইকুয়েডরের মোট পাখি প্রজাতির প্রায় ৮০ শতাংশ এবং সারা পৃথিবীর মোট পাখি প্রজাতির আট ভাগের এক ভাগ।

স্থানীয় মানুষকে বনরক্ষী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে, তাদের হাতে তুলে দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির আলো, আর বৃক্ষরোপণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তার হারানো যৌবন। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, একবার বনাঞ্চল উজাড় হয়ে গেলেও মানুষের সঠিক পরিচর্যায় মাত্র তিন দশকেই প্রকৃতিতে ফিরে আসতে পারে প্রায় ৯০ শতাংশ নতুন ভারসাম্য।

আজও সেই তাপিচালাকা রিজার্ভের পাহাড়ি পথে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় আড়াই হাজার মিটার উচ্চতায়, ভোরবেলা ঘন কাদামাখা পথ ধরে হাঁটেন স্থানীয় বনরক্ষীরা- রসালো কেঁচো হাতে নিয়ে বারবার ডেকে চলেন জোকোটোকো অ্যান্টপিটাকে, ‘এসো, এসো’ বলে। মুহূর্তের অপেক্ষার পর ঘন ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে আসে থ্রাশ সদৃশ মোটাসোটা সেই পাখি, যে গোগ্রাসে গিলে খায় সামনে রাখা কেঁচোগুলো- যেন বহুদিন কিছু খায়নি।

আজ সেই সংরক্ষিত বনভূমিতে পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায় প্রকৃতির অপার বৈচিত্র্যে। বুয়েনাভেনচুরার গহীন অরণ্যে দেখা মেলে বিরল এল ওরো প্যারাকিট কিংবা উজ্জ্বল হলুদ-গলা টুকান পাখির। আর উচ্চভূমির পরমায়ু চাকানা রিজার্ভে, বরফাবৃত কোটোপ্যাক্সি আগ্নেয়গিরির পটভূমিতে যেখানে ডানা মেলে ওড়ে বিশালাকার আন্দিয়ান কন্ডোর আর ছোট্ট হিলস্টার হামিংবার্ড- সেখানে যেন লেখা হচ্ছে প্রকৃতির পুনর্জন্মের এক নতুন অধ্যায়।

শুধু পাখি সংরক্ষণেই থেমে থাকেনি জোকোটোকো ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম। ইকোট্যুরিজম, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ও শিক্ষা, এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণকে একসূত্রে গেঁথে তারা গড়ে তুলেছে এক সম্পূর্ণ সংরক্ষণ কৌশল। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে মিলে সংরক্ষণ সচেতনতা ও টেকসই জীবনযাত্রার প্রসারেও কাজ করছে সংস্থাটি, আর তাদের ইকোট্যুরিজম কার্যক্রম আশপাশের বাসিন্দাদের জন্য তৈরি করছে কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন পথ।

বিশ্বজুড়ে যখন নানা রাজনৈতিক কারণে সংকুচিত হচ্ছে পরিবেশ রক্ষার তহবিল, ঠিক তখনই জোকোটোকো ফাউন্ডেশন দেখিয়ে দিচ্ছে এক পথ- স্থানীয় মানুষ আর বিজ্ঞানীদের সঠিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদী সদিচ্ছায় কীভাবে রক্ষা করা যায় পুরো পৃথিবীর প্রকৃতিকে। সেদিনের সেই এক অচেনা পাখির ডাক শুধু বনের নীরবতাই ভাঙেনি, বরং শিখিয়ে দিয়েছে বিশ্বকে- প্রকৃতির ধ্বংসপ্রাপ্ত কোনো ভূমিও কীভাবে আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো প্রাণের স্পন্দন।

সূত্র: গার্ডিয়ান