...|...|...

সারাদেশ

রাবির পাখি কলোনিতে বদলে গেছে পরিবেশ, কমেছে পাখির বিচরণ

কামরুজ্জামান, রাবি
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:৪০
Shares
রাবির পাখি কলোনিতে বদলে গেছে পরিবেশ, কমেছে পাখির বিচরণ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: টাইমস টুডে

একসময় গাছের ডালে ডালে পাখির কোলাহল, জলাশয়ে পরিযায়ী পাখির ঝাঁক আর ঝোপঝাড়ে দেশীয় নানা প্রজাতির বিচরণে মুখর থাকত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকা। পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে ২০০৯ সালে বেগম খালেদা জিয়া ও তাপসী রাবেয়া হলের মধ্যবর্তী এলাকাকে ঘোষণা করা হয়েছিল ‘পাখি কলোনি’ হিসেবে। ঘন গাছপালা, ঝোপঝাড় ও জলাশয় ঘিরে গড়ে ওঠা সেই আবাসস্থল এখনো রয়েছে, তবে বদলে গেছে তার চিত্র। কমেছে ঝোপঝাড়, বেড়েছে মানুষের আনাগোনা; আর আগের তুলনায় কমেছে পাখির উপস্থিতিও।

সম্প্রতি সরেজমিনে পাখি কলোনি এলাকায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেও বড় কোনো পাখির সমাবেশ চোখে পড়েনি। পুকুরপাড় ও গাছের আশপাশে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা মিলেছে বক, পাতি কাক ও শালিকের। অথচ একসময় এ এলাকায় নিয়মিত বিচরণ ছিল পানকৌড়ি, নিশিবক, মাছরাঙা, ডাহুক, কাঠঠোকরা, বুলবুল, শালিক, বামুন শালিক, গোবরে শালিক, টিয়া ও বিভিন্ন প্রজাতির বকের।

শুধু পাখি কলোনি নয়, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জলাশয় ও সবুজ এলাকাতেও পাখির আনাগোনা কমেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পাখিপ্রেমীরা। তাদের মতে, আবাসস্থলের পরিবর্তন, গাছ ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়া, জলাশয় লিজ দেওয়া ও মাছ ধরার কারণে মানুষের আনাগোনা বৃদ্ধি, শব্দদূষণ এবং পাখি ধরার মতো কর্মকাণ্ড এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

যে ক্যাম্পাসে দেখা গেছে ২০০ প্রজাতির বেশি পাখি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন ধরেই বন্য পাখির বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক পাখি পর্যবেক্ষণ ও তথ্যভান্ডার ‘ই-বার্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, রাবি ক্যাম্পাসে এখন পর্যন্ত ২০৫ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে।

ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাড়া নিশিবক ও পানকৌড়িদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কলোনি হিসেবেও পরিচিত। সুউচ্চ গাছগুলোতে এসব পাখি বাসা করে, ডিম দেয় ও বাচ্চা তোলে। পাশাপাশি আশপাশের জলাশয় থেকে তারা মাছ, কীটপতঙ্গসহ প্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করে।

শীত মৌসুমে এসব জলাশয়ে দেখা মেলে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরও। ছোট সরালি, বড় সরালি, ল্যাঞ্জাহাঁসসহ হাঁসজাতীয় বিভিন্ন পাখি প্রতিবছর ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোতে আশ্রয় নেয়। অতীতে এসব জলাশয়ে দলবদ্ধ পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল পরিচিত দৃশ্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী, বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ও বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী স্বেচ্ছাসেবক ফাহিম মুনতাসির রাফিন দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসের পাখিদের ছবি তুলছেন। তার পর্যবেক্ষণে গত কয়েক বছরে পাখির কলোনিগুলোর চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

ফাহিম মুনতাসির রাফিন বলেন, প্রায় পাঁচ বছর আগেও ক্যাম্পাসের এসব এলাকায় প্রচুর পাখি দেখা যেত। কলোনিগুলোতে পাখির বাসার সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেই সংখ্যা কমে এসেছে।

তার মতে, এর অন্যতম কারণ খাদ্য ও আবাসস্থলের সংকট। পাখিদের কলোনির আশপাশের পুকুরগুলো তাদের খাদ্যের প্রধান উৎস। এসব পুকুরে মাছ ও কীটপতঙ্গ সহজে পাওয়ার কারণেই পাখিরা সেখানে বাসা বাঁধে। কিন্তু পুকুর লিজ দেওয়া, মাছ ধরা এবং মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় পাখিরা খাদ্য হারাচ্ছে এবং নিরাপদ পরিবেশ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

পুকুরগুলোতে লিজ দেওয়া এবং মাছ ধরাসহ মানুষের আনাগোনা বাড়ায় পাখিরা খাদ্য হারিয়েছে। মানুষের অবাধ বিচরণের ফলে জায়গাগুলো পাখির জন্য কিছুটা ভয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।শুধু জলাশয় নয়, পাখিদের বাসা ও প্রজননস্থলেও মানুষের হস্তক্ষেপ বাড়ছে বলে জানান ফাহিম।

তিনি বলেন, কলোনিগুলোতে মানুষের উৎপাত বেড়েছে। অনেকে পাখির বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। আবার দুর্গন্ধের কথা বলে অনেক সময় পাখিদের বিরক্ত করার ঘটনাও দেখা যায়। ফলে পাখিদের খাদ্য ও আবাস—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ফাহিমের মতে, “খাদ্য ও আবাস—দুইয়েরই অসুবিধা হচ্ছে; যা মানবসৃষ্ট। আর এর কারণেই কলোনিগুলোতে তুলনামূলকভাবে কম পাখির আবাস হচ্ছিল।”

পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার চিত্রের মধ্যেও সংরক্ষণমূলক উদ্যোগের ইতিবাচক ফল পাওয়ার একটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন ফাহিম মুনতাসির রাফিন।

তিনি জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শীত মৌসুমে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পুকুরে হাঁসজাতীয় পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি খুবই কম ছিল। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ বর্ষে পাখিপ্রেমীদের দাবির প্রেক্ষিতে রহমতুন্নেসা ও রোকেয়া হলের মাঝামাঝি একটি পুকুর পরীক্ষামূলকভাবে লিজ না দিয়ে রাখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।


ফাহিম বলেন, “২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই পুকুরে আগের দুই বছরের তুলনায় বহুগুণ বেশি পাতি সরালি জাতীয় পাখি এসেছিল।”

শুধু জলাশয়ের ক্ষেত্রেই নয়, একই সময়ে পাখির কলোনিতেও কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য মতে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পশ্চিমপাড়ার পাখি কলোনিতে নিশিবক, ছোট ও দেশি পানকৌড়ি, ছোট বকসহ অন্যান্য পাখি আগের এক-দুই বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি বাসা করেছে।

এই পর্যবেক্ষণ থেকে ফাহিমের মতে, পাখির আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস সংরক্ষণ করা গেলে ক্যাম্পাসে পাখির উপস্থিতি বাড়ানো সম্ভব। ক্যাম্পাসের পুকুরগুলো সংরক্ষণ করলে, গাছগুলো রক্ষা করলে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন করতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে রক্ষা করতে পারবে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের উদ্যোগ এবং শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ততা দরকার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ বেড়েছে। নতুন ভবন, রাস্তা ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বেশ কিছু এলাকায় গাছপালা, ঝোপঝাড় ও জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে।

পাখিদের জন্য গাছ শুধু বসার জায়গা নয়। গাছের ডাল, কোটর ও পাতার আড়াল তাদের বাসা ও আশ্রয়ের অংশ। একইভাবে ঝোপঝাড় ছোট পাখির নিরাপদ আশ্রয় এবং বিভিন্ন পোকামাকড়ের আবাসস্থল। এসব পোকামাকড় আবার অনেক পাখির খাদ্যের অংশ।

ফলে কোনো এলাকার গাছপালা ও ঝোপঝাড়ের কাঠামো বদলে গেলে তার প্রভাব পড়তে পারে পাখির খাদ্য ও প্রজননসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রে।

এর আগে রাবির জলাশয়ে পাখি কমে যাওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জলাশয়ে মাছ ধরা, উচ্চ শব্দ ও নিরাপদ পরিবেশের পরিবর্তনকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

আবাসস্থল পরিবর্তনের পাশাপাশি পাখি ধরার অভিযোগও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

রহমতুন্নেসা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আরমিন জাহান আভা বলেন, আগে মহিলা হলগুলোর আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় ও অতিথি পাখি দেখা যেত। জলাশয়, বড় গাছ ও সবুজ পরিবেশের কারণে পাখিরা সেখানে নিরাপদে থাকতে ও বাসা বাঁধতে পারত। কিন্তু বর্তমানে আগের তুলনায় পাখির আনাগোনা অনেকটাই কমে গেছে।

তিনি বলেন, গাছপালা ও ঝোপঝাড় কমে যাওয়া, জলাশয়ের পরিবেশের পরিবর্তন, মানুষের চলাচল ও অতিরিক্ত শব্দ এর অন্যতম কারণ হতে পারে। পাশাপাশি কিছু রিকশাচালকের পাখি ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক।

পাখি ধরা বা শিকার বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করে তিনি বলেন, নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো, পুরোনো গাছ সংরক্ষণ, নতুন গাছ লাগানো এবং জলাশয়ের পরিবেশ ঠিক রাখা প্রয়োজন।

পাখি কমা কি জীববৈচিত্র্য কমার সংকেত?

পাখির উপস্থিতি কমে যাওয়াকে শুধু পাখির সংখ্যা কমার বিষয় হিসেবে দেখছেন না পরিবেশসংশ্লিষ্টরা। একটি এলাকার পাখির প্রজাতি ও সংখ্যা পরিবর্তিত হলে সেখানে খাদ্য, পানি, আশ্রয় কিংবা প্রজননের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে কি না—সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় সবুজ ক্যাম্পাসে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে পাখি, গাছপালা, জলাশয়, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন জীব একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।

তবে পাখির সংখ্যা বা প্রজাতি কমার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণে নিয়মিত বৈজ্ঞানিক জরিপ ও দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন। শুধু চোখে দেখা বা বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পাখির সংখ্যা কমার হার নির্ধারণ করা যায় না।

পাখিদের আবাসস্থল ও পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলীম বলেন, বহিরাগত পাখিশিকারিদের ক্যাম্পাসে কখনোই অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে শিক্ষার্থীদের চলাচল বন্ধ করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের উত্তর দিকে একটি জঙ্গল ছিল, যেখানে অনেক পাখির আবাস ছিল। নিষেধ করার পরও প্রশাসনের সময়ে ওই এলাকার একটি অংশের জঙ্গল কেটে ফেলা হয়। এর কারণেও পাখির সংখ্যা কমে গেছে।

পাখিদের জন্য অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে ক্যাম্পাসের সবুজ অঞ্চল ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হয়—এমন কোনো কার্যক্রম যাতে না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন সচেতন রয়েছে।

ঘোষণার ১৭ বছর পর প্রশ্ন সংরক্ষণ নিয়ে

২০০৯ সালে পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল যে এলাকাকে, প্রায় ১৭ বছর পর সেই এলাকাতেই পাখির আনাগোনা কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

পাখি কলোনি ঘোষণা করাই শেষ কথা নয়; প্রয়োজন ঘোষিত আবাসস্থলের নিয়মিত নজরদারি, পাখির প্রজাতি ও সংখ্যা পর্যবেক্ষণ, গাছ ও ঝোপঝাড় সংরক্ষণ এবং জলাশয়গুলোকে পাখিবান্ধব রাখা।

ফাহিম মুনতাসির রাফিনের পর্যবেক্ষণে একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে—যেখানে মানুষের চাপ কমেছে এবং জলাশয় সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেখানে পাখির উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। এটি অন্তত ইঙ্গিত দেয়, ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংরক্ষণমূলক সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব থাকতে পারে।

তাই পাখি কলোনির ভবিষ্যৎ শুধু একটি ঘোষণার ওপর নির্ভর করছে না। নির্ভর করছে সেখানে থাকা গাছ, ঝোপঝাড়, জলাশয় এবং পাখিদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ পরিবেশ কতটা রক্ষা করা যাচ্ছে তার ওপর।

একসময় যে ক্যাম্পাসে ২০০টির বেশি প্রজাতির পাখির উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে, সেই বৈচিত্র্য ধরে রাখতে এখন প্রয়োজন উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য। নইলে ‘পাখি কলোনি’ নামটি থেকে গেলেও একসময় সেখানে পাখিই হয়তো কমে যাবে।