মৌলভীবাজার সদর উপজেলাসহ জেলার প্রায় সব এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের লেখাপড়ার মান আগের চেয়ে অনেক খারাপ। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। প্রতিবছরই সরকারি প্রাথমিকে ভর্তির পরিমাণ কমছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও নিয়মিত কমছে।
বৃহস্পতিবার ( ৩ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বাজার বা সড়কের পাশের স্কুলগুলোতে কিছুটা উপস্থিতি থাকলেও গ্রামের স্কুলগুলোর অবস্থা শোচনীয়।
অনেক বিদ্যালয়ে ৬০-৭০ জন, কোথাও ৮০-৯০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। অথচ ভর্তি খাতায় সংখ্যা অনেক বেশি। মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশের উপস্থিতিও পাওয়া যায়নি। শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বেসরকারি বিদ্যালয় বা কিন্ডারগার্টেনে শিশুরা যেসব সুযোগ-সুবিধা পায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সেখানে অনেক পিছিয়ে। সরকারি শিক্ষকদের গুণগত মান আগের মতোই আছে, কিন্তু তারা শিক্ষার্থীদের নতুন কিছু দিতে পারছেন না। শিক্ষকদের মাঝেমধ্যে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে শিক্ষার মান বাড়তো বলে তারা মনে করেন।
সিরাজ আহমদ নামের এক অভিভাবক বলেন, আমার দুই সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিল। পড়ালেখার মান ভালো না থাকায় তাদেরকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছি। স্কুলে যেদিন শিক্ষার্থী থাকে, সেদিন শিক্ষক থাকেন না। আবার শিক্ষক থাকলে শিক্ষার্থী থাকে না। বেশির ভাগ স্কুলে স্থানীয় শিক্ষক থাকায় তাদের প্রভাব থাকে, এজন্য তারা ইচ্ছেমতো আশা-যাওয়া করেন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় মোট ১ হাজার ৬১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ১ হাজার ৫২টি। জেলায় কর্মরত প্রধান শিক্ষক ৭৭৬ জন। প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ ২৭৪টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন ৫ হাজার ১৫৬ জন। সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে ২২৩টি।
বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রধান শিক্ষকের পদে পদোন্নতি হচ্ছে না। কিছু বিদ্যালয়ে আসবাবপত্র ও অবকাঠামোগত সংকটও প্রকট। বাজার এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কিছুটা বেশি হলেও সেখানেও একই সংকট।
এদিকে সরকারি প্রতিটি স্কুলে কাগজপত্রে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি রয়েছে। তবে এসব কমিটি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বা শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
সচেতন অভিভাবকেরা জানান, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে সরকারি বা বেসরকারিভাবে তেমন উদ্যোগ নেই। কারণ যারা উদ্যোগ নেওয়ার কথা, তাদের সন্তানরা এসব স্কুলে পড়ে না। এসব স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের। নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় শিক্ষকরা ক্লাস ফাঁকি দেন বলেও অভিযোগ।
এ বিষয়ে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হয়। তাহলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির জন্য অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।
প্রধান শিক্ষক-সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরাসরি খুব কম নিয়োগ হয়। বিভিন্ন জটিলতায় একসাথে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে নিয়োগ দেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শিক্ষাবৃত্তি, নিয়মিত মনিটরিং ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়বে এবং শিক্ষার্থীরা আবার সরকারি স্কুলমুখী হবে।


