...|...|...

বিশ্ব

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জমিতে বন্দিশিবির-সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে আরাকান আর্মি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৮
Shares
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জমিতে বন্দিশিবির-সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে আরাকান আর্মি

ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ধ্বংস এবং তাদের উচ্ছেদ করার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। রোহিঙ্গাদের কৃষিজমি ও বসতি দখল করে সেখানে বন্দিশিবির, সামরিক ঘাঁটি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য বসতি গড়ে তুলেছে বিদ্রোহী এই গোষ্ঠীটি। 

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র, জাতিসংঘের গবেষণা এবং ভুক্তভোগীদের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন বুথিডং টাউনশিপের হ্নগেট থায় এলাকায় যে জমিতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ধান চাষ করতেন, সেখানে পরবর্তীতে ১২০টি ধূসর রঙের ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো মূলত আরাকান আর্মি পরিচালিত বন্দিশিবির, যেখানে আশপাশের এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আটকে রাখা হয়েছে। শিবিরের বাসিন্দারা বিনা অনুমতিতে বাইরে যাওয়া বা ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান না। উত্তর রাখাইনের অধিকাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে আরাকান আর্মি এ ধরনের অন্তত ১০টি শিবির তৈরি করেছে।

বাস্তুচ্যুতি ও জোরপূর্বক শ্রমের শিকার

রোহিঙ্গারা মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এবং রাখাইনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তাণ্ডবের মুখে প্রাণ বাঁচিয়ে ইতোমধ্যেই ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়শিবিরে থাকা ১৮ বছর বয়সী মুহাম্মদ আরেস জানান, আরাকান আর্মি এলাকায় প্রবেশের পরই তীব্র লড়াই শুরু হয় এবং বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান। তার ভাষায়, তারা আমাদের পুরো গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেয় এবং সব বাস্তুচ্যুত মানুষকে জোর করে শিবিরে বন্দি করে। আমাদের মাতৃভূমিকে তারা জোরপূর্বক শ্রম ও সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে।

মাযু নদীর তীরের ওয়েত নিয়ো তাউং এলাকা থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে এমন আরেকটি বন্দিশিবির অবস্থিত। ২০২৪ সালের এপ্রিলে ওই এলাকা পুড়িয়ে দেওয়ার সময় বহু কৃষক ও জেলের বসতি ও ফলের বাগান ধ্বংস হয়ে যায়। ২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিক জানান, বিদ্রোহীরা সব বড় গাছ ও ফলের বাগান কেটে জমি সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে গ্রামের নামচিহ্ন পর্যন্ত মুছে দিয়েছে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা জানান, নিজেদের বাড়ি ভেঙে সেই উপকরণ দিয়েই আরাকান আর্মির জন্য নতুন সামরিক ব্যারাক (এপি ব্যাটালিয়ন) তৈরিতে বাধ্য করা হয়েছিল তরুণদের। সাদিক আরও জানান, রাস্তা পরিষ্কার, পরিখা খনন ও কায়িক শ্রমের সময় কেউ ক্লান্ত হয়ে পড়লে তাকে রোদের মধ্যে ফেলে রাখা হতো।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও উদ্বেগ

জাতিসংঘের এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর জমি দখল করে শিবির, সামরিক অবকাঠামো বা অন্য সম্প্রদায়ের বসতি স্থাপন করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করার এমন অন্তত ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘ।

২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের পর মিয়ানমারে অবশিষ্ট থাকা প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গার এক-চতুর্থাংশই এই সময়ে দেশ ছেড়েছে।

মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের এক বেনামী বিশেষজ্ঞ দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির সমাপ্তি এখানেই ঘটছে—এ নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। শিবিরগুলোতে যতদিন ইচ্ছা তারা থাকতে পারে, কিন্তু তাদের নিজ বাড়িতে ফেরার কোনো অনুমতি দেওয়া হবে না।

গার্ডিয়ানের সংগৃহীত তথ্য ও জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেফতার, জোরপূর্বক শ্রম, সেনাবাহিনীতে জোর করে লোকবল নিয়োগ এবং চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে—যা একসময় মিয়ানমার সেনাবাহিনীও ব্যবহার করত। হোইয়ার সিরিতে ২০২৪ সালের ২ মে সংঘটিত গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া অনেককেই হ্নগেট থায় বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, ওই হত্যাকাণ্ডে প্রায় ৯০ শিশুসহ ১৭০ জনের বেশি গ্রামবাসী নিহত বা নিখোঁজ হন।

যুদ্ধাপরাধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

যুদ্ধাপরাধের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আরাকান আর্মির দাবি, তারা কেবল সরকারি সামরিক বাহিনী এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদেরই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।

মিয়ানমারের স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান জানান, রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার পেছনে একটি ‘পরিকল্পিত বাস্তবতা তৈরি করার’ উদ্দেশ্য ছিল। তবে রোহিঙ্গাদের জমি ধ্বংসের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে আরাকান আর্মিই দায়ী কি না, তা জাতিসংঘের তদন্ত সংস্থা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেনি। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক টম ড্যানেনবাম মন্তব্য করেছেন যে, রোহিঙ্গাদের জবরদস্তি ও নিজ এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করার এই সমন্বিত প্রক্রিয়া ‘জনসংখ্যা স্থানান্তর’-এর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকারের সাবেক রোহিঙ্গা প্রতিনিধি অং কিয়াও মো সতর্ক করে বলেছেন, মূল প্রশ্ন এখন আর রোহিঙ্গাদের টিকে থাকা নিয়ে নয়, বরং এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে কি না, যা তাদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করার বিষয়টিকে চিরস্থায়ী করে তুলবে।

উল্লেখ্য, চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার রায় দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে, আইসিজে পরিকল্পিতভাবে মানুষ উচ্ছেদ ও বাড়িঘর ধ্বংস করাকে গণহত্যার অন্যতম একটি উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।