ব্যস্ততার চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, পানিশূন্যতা কিংবা দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ও কম্পিউটারের পর্দায় তাকিয়ে থাকার কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। এ ধরনের ব্যথাকে অনেকেই স্বাভাবিক সমস্যা মনে করে ওষুধ সেবন করেন বা বিশ্রাম নিয়ে তা কমানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মাথাব্যথার ধরন পাল্টে গেলে, ব্যথা ক্রমেই বাড়তে থাকলে কিংবা এর সাথে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেওয়া প্রয়োজন।
সাধারণ মাথাব্যথার অধিকাংশ কারণ গুরুতর নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের টিউমারসহ স্নায়ুতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতার কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে। তাই শুধু ব্যথার তীব্রতা নয়, এর ধরন, স্থায়িত্ব এবং সাথে দেখা দেওয়া অন্যান্য লক্ষণের দিকেও নজর রাখা জরুরি।
হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নেহা পণ্ডিতা জানিয়েছেন, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, শরীরে পানির অভাব ও চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ মাথাব্যথার পরিচিত কারণ। তবে ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে কিংবা স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন মনে হলে এর পেছনে অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
ইয়াথার্থ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও গ্রুপ ডিরেক্টর ডা. কুনাল বাহরানির মতে, আগে যে ধরনের মাথাব্যথা হতো, তার সাথে নতুন ব্যথার পার্থক্য থাকলে কিংবা বারবার ব্যথা ফিরে এলে সতর্ক হওয়া উচিত। সাধারণ চিকিৎসায় আরাম না পাওয়া এবং কাশি, সামনে ঝোঁকা বা ব্যায়ামের সময় ব্যথা বেড়ে যাওয়াও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কারণ হতে পারে।
মস্তিষ্কের টিউমার কোথায় তৈরি হয়েছে এবং সেটি মস্তিষ্কের কোন অংশকে প্রভাবিত করছে, তার ওপর উপসর্গ নির্ভর করে। এ ক্ষেত্রে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে, সেগুলো হলো-
১. মাথাব্যথার ধরন ও তীব্রতা বদলে যাওয়া
আগের তুলনায় বেশি ঘন ঘন মাথাব্যথা হওয়া, ব্যথা ধীরে ধীরে তীব্র হওয়া কিংবা ব্যথার ধরনে পরিবর্তন আসা অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে মাথাব্যথার পাশাপাশি অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
২. সকালে ঘুম থেকে উঠে বেশি ব্যথা অনুভব করা
কিছু ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথাব্যথা বেশি হতে পারে। আবার ব্যথার কারণে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। এর সাথে বমি বমি ভাব বা বমি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৩. চোখে দেখার সমস্যা দেখা দেওয়া
দৃষ্টিশক্তিতে নতুন পরিবর্তন, ঝাপসা দেখা কিংবা একটি বস্তুকে দুটি করে দেখার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণকে শুধু চোখের ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
৪. মাথা ঘোরা ও চলাফেরায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
বারবার মাথা ঘোরা, হাঁটার সময় ভারসাম্য ধরে রাখতে অসুবিধা কিংবা শরীরের অঙ্গগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষায় সমস্যা দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ আক্রান্ত হলে এমন উপসর্গ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৫. হাত-পায়ে দুর্বলতা বা অনুভূতির পরিবর্তন
হাত কিংবা পায়ে দুর্বলতা, অবশ ভাব বা স্বাভাবিক অনুভূতিতে পরিবর্তন স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। শরীরের এক পাশ হঠাৎ দুর্বল হয়ে গেলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
৬. কথা বলতে বা সঠিক শব্দ খুঁজে পেতে সমস্যা
কথা বলার স্বাভাবিক ক্ষমতা কমে যাওয়া, পরিচিত শব্দ মনে করতে বা খুঁজে পেতে অসুবিধা এবং কথা বলার ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের ভাষা নিয়ন্ত্রণকারী অংশের সমস্যার সাথে এ ধরনের লক্ষণের সম্পর্ক থাকতে পারে।
৭. স্মৃতি, মনোযোগ ও আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
আগের মতো মনে রাখতে না পারা, কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা, অস্বাভাবিক বিরক্তি কিংবা মেজাজ ও ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। অনেকেই এসব সমস্যাকে ক্লান্তি বা মানসিক চাপের ফল মনে করেন। তবে পরিবর্তনগুলো স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৮. জীবনে প্রথমবার খিঁচুনি হওয়া
আগে কখনো খিঁচুনির অভিজ্ঞতা নেই, এমন কারও হঠাৎ খিঁচুনি দেখা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। মস্তিষ্কের টিউমার ছাড়াও বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যায় এমন হতে পারে। তাই প্রথমবার খিঁচুনি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কখন চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন?
মাথাব্যথা হলেই মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। মাইগ্রেন, সংক্রমণ, চোখের সমস্যা এবং অন্যান্য শারীরিক বা স্নায়বিক অসুস্থতার কারণেও মাথাব্যথা হতে পারে।
তবে ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমাগত বাড়তে থাকলে কিংবা আগের তুলনায় ভিন্ন ধরনের মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মাথাব্যথার সাথে দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, বারবার বমি, দুর্বলতা বা ভারসাম্য হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দিলেও অবহেলা করা যাবে না।
অন্যদিকে, হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথাব্যথা শুরু হওয়া, প্রথমবার খিঁচুনি দেখা দেওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা শরীরের এক পাশ হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, এই আটটি লক্ষণ থাকলেই মস্তিষ্কে টিউমার রয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। উপসর্গের কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা নিলে গুরুতর সমস্যার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।


