...|...|...

লাইফস্টাইল

মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয়, কীভাবে সামলাবেন

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, বিকেল ৫:২০ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৩:০৫
Shares
মাইগ্রেনের ব্যথা কেন হয়, কীভাবে সামলাবেন

ঢাকার হালচাল বদলাতে যত সময় লাগেনি, মাইগ্রেন সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলাতে তার চেয়েও বেশি সময় লেগেছে। অফিসের ফ্লুরোসেন্ট আলো, অনিদ্রা রাত, ট্রাফিকজ্যামে আটকে থাকা বাস- সব মিলিয়ে আজকাল অনেকেই মাথার একপাশে ধুকধুক করা ব্যথাকে ‘সাধারণ মাথাব্যথা’ ভেবে উড়িয়ে দেন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইগ্রেন আসলে মাথাব্যথার চেয়েও অনেক বড় এক স্নায়ুবিক সমস্যা।

মজার ব্যাপার হলো, এই রোগের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রাচীন মিসরের এবার্স প্যাপিরাসে ‘মাথার একপাশের ব্যথার’ উল্লেখ আছে, আর সেখানে সমাধান হিসেবে মাথার তালুতে ভাজা মাছ লাগানোর কথা লেখা! রোমান চিকিৎসক গ্যালেন আবার ‘হেমিক্রেনিয়া’ বলে যে রোগের বর্ণনা দেন, সেটাই পরের যুগে মাইগ্রেন নাম পায়। তার প্রায় সব রোগেরই প্রেসক্রিপশনে থাকত রক্তমোক্ষণ-মাইগ্রেনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন আর মাইগ্রেনকে অতিরিক্ত সেন্টিমেন্টাল বা দুর্বল স্নায়ুর লক্ষণ বলা হয় না; বরং এটাকে একটি প্রাইমারি নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার হিসেবে ধরা হয়, যার পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট শারীরবৃত্তীয় কারণ। 

মাথাব্যথা মানেই মাইগ্রেন নয় 

মাথাব্যথা এই এক শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক ধরনের সমস্যা। সাধারণভাবে ডাক্তাররা মাথাব্যথাকে দুই ভাগে দেখেন। ১. প্রাইমারি হেডেক: যেগুলোর পেছনে কোনো বড় ধরনের কাঠামোগত রোগ থাকে না। আর ২. সেকেন্ডারি হেডেক: যেগুলো স্ট্রোক, টিউমার, মেনিনজাইটিস বা ব্রেন হেমোরেজের মতো কারণে হয়। 

হ্যাংওভার–জাত মাথাব্যথা যেমন সেকেন্ডারি, আবার ক্লাস্টার হেডেকের মতো তীব্র ব্যথা প্রাইমারি। মাইগ্রেনও প্রাইমারি ক্যাটাগরির রোগ—কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময়ই তা ভুল করে সেকেন্ডারি ভেবে চিকিৎসা চলে যায় অন্যদিকে। 

নিউরোলজিস্টরা রোগীকে কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বোঝার চেষ্টা করেন, তিনি আসলে কোন ধরনের মাথাব্যথায় ভুগছেন। যেসব ক্ষেত্রে- মাথার একপাশে ধুকধুক করা ব্যথা হয়, বমি বমি ভাব বা বমি থাকে, আলো ও শব্দ একেবারে সহ্য হয় না, রোগী অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকতে চান, নড়াচড়া করতে চান না ইত্যাদি। সেসবই সাধারণত মাইগ্রেনের ক্ল্যাসিক ছবি।

মাইগ্রেন আসলে কোথা থেকে শুরু হয়?

আমাদের মাথার ভেতরে আছে ট্রাইজেমিনোভাসকুলার সিস্টেম- স্নায়ু ও রক্তনালীর এক জটিল নেটওয়ার্ক, যা ব্যথা শনাক্ত করার কাজ করে। এই নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে থাকে ট্রাইজেমিনাল নার্ভ নামের একটি বড় স্নায়ু, যা মুখ-মাথায় স্পর্শ, ব্যথা, তাপমাত্রার অনুভূতি বহন করে, আবার চিবানোর মতো মোটর কাজও দেখে। এই সিস্টেমের কোথাও গন্ডগোল হলে স্নায়ু থেকে নিঃসরণ হয় সিজিআরপি (Calcitonin Gene-Related Peptide) নামের একটি রাসায়নিক। এই সিজিআরপি মস্তিষ্কের ব্যথা–নেটওয়ার্ককে এমনভাবে সক্রিয় করে, যার ফলাফল হয় মাঝারি থেকে অসহ্য ধরনের মাথাব্যথা। একসময় বলা হতো, ‘মস্তিষ্কের রক্তনালীর সংকোচন-প্রসারণই মাইগ্রেনের কারণ’—একে বলা হতো ভাস্কুলার থিওরি। কিন্তু আধুনিক গবেষণা দেখাচ্ছে, শুধু রক্তনালী নয়, স্নায়ু ও রাসায়নিক সিগনালের জটিলতার সমন্বয়েই তৈরি হয় মাইগ্রেন।

মাইগ্রেনের চারটি ধাপ: মাথাব্যথার আগে ও পরে কী ঘটে

মাইগ্রেন শুধু একটানা মাথাব্যথা নয়; এটি একটি ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া।

১. আগাম সতর্কতা: মাইগ্রেন শুরু হওয়ার একদিন আগেও শরীর সংকেত দিতে শুরু করতে পারে। এই ধাপে- হঠাৎ অনেক হাই ওঠা, বেশি ক্লান্ত লাগা, বারবার প্রস্রাব লাগা, অদ্ভুত ধরনের খাবারের প্রতি ঝোঁক (চকলেট, পনির ইত্যাদি)। এসবই দেখা যেতে পারে। আগে মনে করা হতো, চকলেট বা পনির খাওয়ার জন্যই নাকি মাইগ্রেন হয়। পরে মস্তিষ্কের ইমেজিংয়ে দেখা গেছে, ব্যথা শুরু হওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগে থেকেই মস্তিষ্কের কিছু অংশ এমনভাবে কাজ শুরু করে, যা খাবারের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বাড়ায়। অর্থাৎ খাবার নয়, বরং আসন্ন মাইগ্রেনই আপনাকে সেই খাবার খাওয়াতে চাইছে।

২. স্নায়ুর অদ্ভুত সব খেলা: প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী ‘অরা’ পর্ব অনুভব করেন। এতে চোখের সামনে আলোর রেখা, ঝলক বা আঁকা-বাঁকা রেখা দেখা, হাত-পা বা মুখে ঝিনঝিনি/অবশভাব, কথা বলতে হোঁচট খাওয়া- এসব হতে পারে। অনেকেই এই ধাপকে প্রথমে স্ট্রোক ভেবে ভয় পেয়ে যান।

৩. মাইগ্রেন- মূল আক্রমণ: এরপর শুরু হয় সেই পরিচিত ধপধপ করা ব্যথা, যা সাধারণত ৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। এই সময় সাধারণ আলোও খুব তীক্ষ্ণ মনে হয়, সামান্য শব্দও অসহ্য লাগে, গন্ধেও বিরক্তি তৈরি হতে পারে। 

৪. ব্যথার পরের ক্লান্তি: ব্যথা কমে গেলেও শরীর আর মস্তিষ্ক দুটোই পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও এক–দুই দিন সময় নেয়। অনেকে বলেন, ‘মাথা যেন কুয়াশায় ঢাকা’, বা  ‘মনোযোগ পাওয়া যাচ্ছে না।’

অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কি একসময় ছিল বাঁচার কৌশল?

প্রশ্ন আসতে পারে- এত ঝামেলার একটা সিস্টেম থাকল কেন? বিজ্ঞানীরা বলছেন, হয়তো এক সময় এই অতিরিক্ত সংবেদনশীলতাই মানুষের বাঁচার সুবিধা দিয়েছে। একটি মত অনুযায়ী, মেনিনজাইটিস, টিউমার বা মাথায় আঘাতের মতো গুরুতর সমস্যা হলে যদি কেউ বেশি মাথাব্যথা–প্রবণ হন, তাহলে তা ভালো; কারণ এতে শরীর দ্রুত সংকেত দেয়, সমস্যা শুরু হয়েছে। আরেক মত অনুযায়ী, গুহাবাসী যুগে যারা শব্দ, আলো ও পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনেও বেশি সতর্ক থাকতেন- তারা হয়তো রাতের বেলা শিকারির হামলা আগে টের পেতেন, গভীর ঘুমে ডুবে যেতেন না। এই সতর্কতার জিনই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে থেকে গেছে। কিন্তু আজকের পৃথিবী বদলে গেছে। আমরা আর গুহার সামনে আগুন জ্বালিয়ে পাহারা দিই না; বরং দিনের বড় অংশ কাটাই লাইটেড অফিস, অনলাইন মিটিং আর স্ক্রিনের সামনে। সেই পুরোনো সতর্কতা এখন অনেকের জন্যই হয়ে উঠেছে উৎপাদনশীলতার বড় বাধা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই মাইগ্রেনকে পৃথিবীর সবচেয়ে অক্ষমকারী রোগগুলোর তালিকায় প্রথম দশের মধ্যে রেখেছে- মানে, যারা নিয়মিত মাইগ্রেনে ভোগেন, তাদের জন্য এটি শুধু মাথাব্যথা নয়, বরং দৈনন্দিন জীবন আটকে দেওয়ার মতো এক বড় রোগ।

কারা বেশি ঝুঁকিতে?

মাইগ্রেন সাধারণত জীবনের সবচেয়ে কর্মব্যস্ত সময়টাতেই বেশি দেখা যায়- বয়ঃসন্ধি থেকে মেনোপজের মাঝের বছরগুলোতে। অনেকের ক্ষেত্রে মাসের বেশিরভাগ দিনই স্বাভাবিকভাবে কাজ করা যায় না। অফিস, সংসার, পড়াশোনা- সবকিছুতেই ব্যাঘাত ঘটে। এর সঙ্গে আরেকটি সমস্যা জুড়ে আছে-এখনও অনেক পরিবার, সহকর্মী, এমনকি কিছু চিকিৎসকও এটাকে বাস্তব অসুখ হিসেবে দেখতে চান না। তারা ভাবেন, এত কিছুই না। এই ভ্রান্ত ধারণা রোগীদের চিকিৎসা নেওয়া ও চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

পরিসংখ্যান বলছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ মাইগ্রেনে ভোগেন। হরমোনের ওঠানামা, ব্যথা–সংবেদনশীল সিস্টেমের পার্থক্য-সব মিলিয়েই এ ব্যবধান তৈরি হতে পারে। অনেকের মতে, নারীর রোগ বলে এটিকে ঐতিহাসিকভাবে ততটা গুরুত্বও দেওয়া হয়নি।

কী কী কারণে মাইগ্রেন বাড়ে?

মাইগ্রেন একদিকে জেনেটিক- পরিবারে থাকলে অনেকেরই ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে জীবনযাপনও এর ওপর বড় প্রভাব ফেলে। সাধারণ কিছু ট্রিগার হলো- ১. কম ঘুম, অনিয়মিত ঘুম, কিংবা টানা অনেকক্ষণ ঘুম। ২. হঠাৎ করে কফি/চা বন্ধ করে দেওয়া (ক্যাফেইন উইথড্রয়াল)। ৩. কম পানি খাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, ডিহাইড্রেশন। ৪. দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ এবং হরমোনের ওঠানামা (অনেক নারীর ক্ষেত্রে মাসিকের আগে–পরে মাইগ্রেন বেশি হয়)। 

স্ক্রিন টাইম নিয়ে এখনও গবেষণার ফল পুরোপুরি একমত নয়। মাইগ্রেন–ভুক্তভোগীরা আলোতে সংবেদনশীল হওয়ায় অনেকেই মনে করেন, ফোন বা কম্পিউটারই মূল অপরাধী। তবে এখন পর্যন্ত সরাসরি কারণ–প্রভাবের প্রমাণ একেবারে পরিষ্কার নয়; বরং আলো, ভঙ্গি, ঘুম, কাজের চাপ-সব মিলিয়েই প্রভাব ফেলছে বলে ধারণা করা হয়।

চিকিৎসায় বিপ্লব: সিজিআরপি–টার্গেটেড ওষুধ

সিজিআরপি নামের রাসায়নিকটির ভূমিকা বোঝার পর থেকেই মাইগ্রেন চিকিৎসায় যেন নতুন দরজা খুলে গেছে। এর ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে দুই ধরনের আধুনিক ওষুধ। ১. জেপ্যান্টস - এগুলো সাধারণত ট্যাবলেট, যা সিজিআরপি রিসেপ্টর ব্লক করে কাজ করে। ২. ম্যাবস (মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি) – ইনজেকশন ফর্মে দেওয়া হয়, অনেক সময় মাসে একবার; এগুলো সরাসরি সিজিআরপি বা তার রিসেপ্টরের বিরুদ্ধে কাজ করে। 

গত চার–পাঁচ বছরে এই দুই ধরনের ওষুধ অনেক রোগীর জীবনে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে- যারা আগে মাসে ১৫-২০ দিন মাথাব্যথায় ভুগতেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন মাসে কয়েক দিনের বেশি ব্যথাই পান না। তবে এই গল্পের আরেক দিকও আছে। এই ওষুধগুলোর দাম এখন বেশ চড়া, অনেক দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় সবার জন্য সহজলভ্যও নয়। পাশাপাশি প্রয়োজন আরও বেশি মাথাব্যথা বিশেষজ্ঞ, সহজ প্রেসক্রিপশন প্রক্রিয়া, আর রোগী–পরিবারের সচেতনতা।

কী করলে নিজের জন্য উপশমের পথ তৈরি করা যায়?

সব রোগীর জন্য এক প্রেসক্রিপশন হয় না, তবে কিছু সাধারণ কাজ অনেকেরই কাজে আসে। ১. নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমের রুটিন বানানো। ২.খাবার ও পানি নিয়মিত রাখা, দীর্ঘ সময় খালি পেটে না থাকা। ৩. ক্যাফেইন হঠাৎ বন্ধ না করে, ধীরে কমানো। ৪. নিজের ট্রিগারগুলো নোট করে রাখা (ডায়েরি রাখতে পারেন) এবং ৫. ডাক্তার পরামর্শ অনুযায়ী প্রযোজ্য হলে প্রতিরোধমূলক ওষুধ নেওয়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটা তো স্রেফ মাথাব্যথা বলে এড়িয়ে না গিয়ে, প্রয়োজনে নিউরোলজিস্ট বা হেডেক স্পেশালিস্টের কাছে যাওয়া।

মাইগ্রেনকে ‘দুর্বলতা’ নয়, স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবেই দেখতে হবে

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আগে মাইগ্রেনকে অনেক সময়ই চরিত্রের দুর্বলতা, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা বা  নারীসুলভ নিস্তেজতা বলে দেখা হতো, এখন আমরা জানি এটি নির্দিষ্ট কারণ ও ধাপসহ একটি স্বীকৃত স্নায়বিক রোগ, যার জন্য প্রমাণভিত্তিক আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে। আপনি যদি মাইগ্রেনে ভোগেন, একটাই কথা মনে রাখুন – এটা আপনার দোষ নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ বাস্তব একটি শারীরিক সমস্যা, যা অনেকের কাজ, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। সুখবর হলো, আজকের দিনে ওষুধ, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও জীবনধারার বদলের মাধ্যমে এই রোগকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বেশি।