...|...|...

লাইফস্টাইল

কেন পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি মাইগ্রেনে ভোগেন

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:০১ | আপডেট: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১:০৬
Shares
কেন পুরুষের চেয়ে নারীরাই বেশি মাইগ্রেনে ভোগেন

ছবি: সংগৃহীত

মাইগ্রেন শুধু ‘মাথাব্যথা’ নয় - এটি একটি জটিল স্নায়বিক রোগ, যা কারও কারও জীবনকে পুরোপুরি থমকে দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রায় একশ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত, কিন্তু এই সংখ্যার একটি বড় অংশ নারী।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, পুরুষের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় তিনগুণ বেশি। প্রশ্ন হলো- কেন?

গত কয়েক দশকের স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা এই প্রশ্নের বেশ কিছু উত্তর দিয়েছে। একটিমাত্র কারণ নয়, বরং জিন, হরমোন, মস্তিষ্কের গঠন ও জীবনযাত্রার নানা উপাদান মিলেই এই ব্যবধান তৈরি করে।

মাইগ্রেন আসলে কী

মাইগ্রেন সাধারণ মাথাব্যথার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টদায়ক একটি অবস্থা। এতে থাকে তীব্র স্পন্দনশীল ব্যথা, বমিভাব, আলো ও শব্দের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা এবং অনেক সময় দৃষ্টিজনিত সমস্যা (যাকে বলে ‘অরা’)।

এটি জিনগত ও স্নায়ুবিষয়ক একটি প্রবণতা - মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট কিছু উদ্দীপকের প্রতি অতিরিক্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, যা শেষ পর্যন্ত ব্যথা-সংক্রান্ত রাসায়নিক নিঃসরণের দিকে নিয়ে যায়।

মাইগ্রেন। ছবি: সংগৃহীত

শৈশবে ছেলে ও মেয়ে প্রায় সমান হারে মাইগ্রেনে আক্রান্ত হয়। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পর থেকে এই চিত্র বদলে যেতে শুরু করে, এবং প্রজনন বয়সে এসে ব্যবধানটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হরমোনের ভূমিকা: মূল কারণ

গবেষকরা মনে করেন, নারী-পুরুষের এই পার্থক্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে যৌন হরমোন, বিশেষত ইস্ট্রোজেন।

স্পেনের উনিভার্সিতাস মিগেল হার্নান্দেজ- এর গবেষকরা দেখেছেন, ইস্ট্রোজেনের মাত্রার ওঠানামা মস্তিষ্কের ট্রাইজেমিনাল স্নায়ুকোষগুলোকে বাহ্যিক উদ্দীপকের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে, যা মাইগ্রেন আক্রমণের পথ তৈরি করে দিতে পারে।

তাদের গবেষণা অনুযায়ী, মাসিকের সময় ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকার সাথে মাইগ্রেনের প্রকোপ বাড়ার একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

ইস্ট্রোজেন হরমোন। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের পিডমন্ট হেলথের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মাই-লিন বুই ব্যাখ্যা করেন, ইস্ট্রোজেন মস্তিষ্কের এমন কিছু রাসায়নিক উপাদান নিয়ন্ত্রণ করে যা ব্যথার অনুভূতির সাথে জড়িত - এর মধ্যে অন্যতম হলো CGRP (calcitonin gene-related peptide) নামের একটি অণু, যা মাইগ্রেনের ব্যথা-পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

তার মতে, পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন অনেকটা উল্টো কাজ করে - এটি স্নায়ুকে সুরক্ষা দেয়, ব্যথার সংকেত কমিয়ে রাখে।

এ কারণেই মাসিক শুরুর ঠিক আগে, যখন ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়, তখন অনেক নারীর মধ্যে ‘মেনস্ট্রুয়াল মাইগ্রেন’ দেখা দেয়। 

আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ নারী, যারা মাইগ্রেনে ভোগেন, তারা এই ধরনের মাসিক-সম্পর্কিত মাইগ্রেনের অভিজ্ঞতা পান, এবং এগুলো সাধারণ মাইগ্রেনের তুলনায় বেশি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

জীবনচক্র জুড়ে হরমোনের প্রভাব

১. বয়ঃসন্ধি: মেয়েদের মাসিক শুরুর সময় থেকেই ছেলে-মেয়ের মধ্যে মাইগ্রেনের হারে ব্যবধান তৈরি হতে শুরু করে।

২. প্রজনন বয়স: এই সময়েই মাইগ্রেন সবচেয়ে বেশি ও তীব্র হয়ে দেখা দেয়।

৩. গর্ভাবস্থা: অনেক নারীর ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায়, বিশেষত দ্বিতীয় ও তৃতীয় ত্রৈমাসিকে, ইস্ট্রোজেনের মাত্রা স্থিতিশীলভাবে বাড়তে থাকায় মাইগ্রেনের প্রকোপ কমে যায়। তবে প্রথম ত্রৈমাসিকে কারও কারও ক্ষেত্রে এটি আরও খারাপ হতে পারে।

৪. পেরিমেনোপজ: মেনোপজের আগের এই রূপান্তর-পর্যায়ে হরমোনের মাত্রা অস্থির ও অনিয়মিত হয়ে ওঠে, যা অনেক নারীর জন্য মাইগ্রেনকে আরও কঠিন করে তোলে।

৫. মেনোপজ-পরবর্তী সময়: হরমোনের মাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়ে যাওয়ায় সাধারণত মাইগ্রেনের তীব্রতা ও ঘনত্ব কমে আসে।

প্রোজেস্টেরন হরমোনও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুচিত্রা জোশির নেতৃত্বে পরিচালিত একটি ২০২৫ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, মাদি ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রোজেস্টেরন রিসেপ্টর সক্রিয় করলে মাইগ্রেন-সংশ্লিষ্ট উপসর্গের প্রতি সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়, আর রিসেপ্টরটি নিষ্ক্রিয় করলে উপসর্গ কমে আসে।

মাদি ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রোজেস্টেরন হরমোনের সক্রিয়তা। ছবি: সংগৃহীত

যদিও প্রাণীর ওপর করা এই গবেষণার ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় না, তবু এটি হরমোন ও মাইগ্রেনের সম্পর্ক বুঝতে নতুন দিক দেখাচ্ছে।

মস্তিষ্কের গঠনগত পার্থক্য

শুধু হরমোন নয়, নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালীতেও কিছু মৌলিক পার্থক্য থাকতে পারে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (UCLA) গবেষকরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, ‘কর্টিক্যাল স্প্রেডিং ডিপ্রেশন’ নামে পরিচিত মস্তিষ্কের একধরনের তরঙ্গ-সদৃশ কার্যকলাপ - যাকে মাইগ্রেনের পেছনের একটি মূল প্রক্রিয়া মনে করা হয় - তা সৃষ্টি করতে স্ত্রী ইঁদুরের তুলনায় পুরুষ ইঁদুরে দুই থেকে তিনগুণ বেশি শক্তিশালী উদ্দীপনার প্রয়োজন হয়।

মস্তিষ্কে ‘কর্টিক্যাল স্প্রেডিং ডিপ্রেশন’ তরঙ্গের কার্যকলাপ। ছবি: সংগৃহীত

অর্থাৎ, স্ত্রী মস্তিষ্ক এই প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য জন্মগতভাবেই অনেক বেশি সংবেদনশীল হতে পারে।

নারীদের মাইগ্রেন কি আলাদাভাবে অনুভূত হয়

সাম্প্রতিক গবেষণায় শুধু মাইগ্রেনের হার নয়, এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বেও লিঙ্গভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্য ল্যানসেট নিউরোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৮টি দেশের প্রায় ৪১ হাজার রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারীরা কেবল বেশি ঘনঘন মাইগ্রেনে আক্রান্ত হন তাই নয়, তারা পুরুষদের তুলনায় বেশি সময় ধরেও এই যন্ত্রণা ভোগ করেন।

গবেষণাটিতে আরও উঠে এসেছে যে, ব্যথানাশক ওষুধের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে অনেক সময় ‘মেডিকেশন ওভারইউজ হেডেক’ নামের একধরনের বাড়তি মাথাব্যথাও তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া, নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি চিকিৎসকের পরামর্শ নেন এবং প্রেসক্রিপশন ওষুধ ব্যবহার করেন। যেসব নারী মাইগ্রেনে ভোগেন, তাদের মধ্যে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

হরমোনের বাইরেও কারণ আছে

চিকিৎসকরা বলছেন, নারীদের মধ্যে মাইগ্রেন বেশি হওয়ার পেছনে জীবনযাত্রা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। পরিবারের একাধিক দায়িত্ব একসাথে সামলানো, ঘুমের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ - বিশেষত তা যখন হঠাৎ কমে যায় - এসব কারণও আক্রমণ ডেকে আনতে পারে।

এর সাথে যুক্ত হতে পারে রক্তে শর্করার ওঠানামা, আবহাওয়ার পরিবর্তন (তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা), এবং আয়রনের ঘাটতি, সিলিয়াক ডিজিজ বা থাইরয়েডের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার মতো স্বাস্থ্যগত সমস্যা।

সংক্ষেপে বলা যায়, মাইগ্রেন কখনও একটিমাত্র কারণে হয় না - বরং একাধিক ছোট ছোট ট্রিগার জমতে জমতে একজন মানুষের সহনসীমা অতিক্রম করে যায়, আর নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনজনিত ওঠানামা এই সহনসীমা আরও দ্রুত পার করিয়ে দেয়।

মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে যা করা যেতে পারে

মাইগ্রেনের সুনির্দিষ্ট কোনো একক প্রতিকার নেই, তবে চিকিৎসকরা সাধারণত নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোর পরামর্শ দেন:

১. ট্রিগার শনাক্ত করা: নিয়মিত হেডেক ডায়েরি রাখলে বোঝা যায় কোন কোন বিষয় ব্যক্তিবিশেষে আক্রমণ ডেকে আনছে।
২. ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস নিয়মিত রাখা: অনিয়মিত ঘুম বা রক্তে শর্করার ওঠানামা এড়িয়ে চলা।
৩. মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা: দীর্ঘমেয়াদি চাপ কমানোর পাশাপাশি হঠাৎ চাপমুক্তির প্রভাবও খেয়াল রাখা।
৪. হাইড্রেশন ও আবহাওয়া-সচেতনতা: পানিশূন্যতা এড়ানো এবং আবহাওয়ার বড় পরিবর্তনের সময় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া।
৬. চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা: ট্রিপট্যানজাতীয় ওষুধ, প্রতিরোধমূলক থেরাপি, এবং দীর্ঘস্থায়ী মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে বোটক্স ইনজেকশন বা অক্সিপিটাল নার্ভ ব্লকের মতো চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মেনস্ট্রুয়াল মাইগ্রেনের ক্ষেত্রে হরমোন-সংক্রান্ত চিকিৎসাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

মাইগ্রেন একটি বাস্তব, গুরুতর স্নায়বিক রোগ - কোনো ‘সাধারণ মাথাব্যথা’ নয়। এটি বোঝা এবং এর প্রতি সঠিক গুরুত্ব দেওয়া, বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে এর ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে, চিকিৎসা ও গবেষণা উভয় ক্ষেত্রেই জরুরি।