বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক- এমন একটা ধারণা আমাদের সবার মধ্যেই কমবেশি আছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. নরম্যান সোয়ান বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলছেন, বিষয়টা এত সরল নয়। বয়স বাড়লেই যে মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমতে থাকবে, এমন কোনো অলিখিত নিয়ম নেই।
তার নতুন বই দ্য ব্রেইন ক্লিফ-এ মস্তিষ্কের ওপর বয়সের প্রভাব এবং দীর্ঘদিন তার কর্মক্ষমতা ধরে রাখার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন সোয়ান। তার বিশ্বাস, কিছু নির্দিষ্ট অভ্যাস গড়ে তুললে মস্তিষ্কে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সময়টা অনেকটাই পিছিয়ে দেওয়া যায়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোয়ান বলেন, বয়স বাড়াকে আমরা কীভাবে দেখি, সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি ইচ্ছে করেই মস্তিষ্কের ‘ক্ষমতা কমে যাওয়া’ শব্দটার বদলে ‘পরিবর্তন’ শব্দটা ব্যবহার করতে চান।

কারণটা সহজ- বিশ বছর বয়সের মস্তিষ্কের সঙ্গে মধ্যবয়সের মস্তিষ্কের তুলনা করলে মনে হতে পারে, বয়সের সাথে সাথে মানুষ যেন তার সব মানসিক সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছে। বাস্তবতা কিন্তু তা নয়। দ্রুত চিন্তা করা কিংবা ঝটপট সমস্যার সমাধান বের করার ক্ষমতা হয়তো যৌবনের শুরুতেই তুঙ্গে থাকে, কিন্তু জ্ঞান, অভিজ্ঞতা আর জীবনের নানা শিক্ষা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বরং আরও সমৃদ্ধ হতে থাকে।
বয়স বাড়ার সাথে মস্তিষ্ক নিজেকে কীভাবে মানিয়ে নেয়
সোয়ান মস্তিষ্কের একটা চমকপ্রদ প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন, যাকে তিনি নাম দিয়েছেন ‘স্ক্যাফোল্ডিং’ বা সহায়ক কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া। বয়স বাড়ার সাথে মস্তিষ্ক নিজে থেকেই বাড়তি কিছু স্নায়বিক সংযোগ তৈরি করে নেয়, যেগুলো তার স্বাভাবিক কাজ চালিয়ে যেতে সহায়তা করে। সোয়ানের ভাষায়, এই সংযোগগুলো অনেকটা উঁচু কোনো ভবনের চারপাশে বসানো নির্মাণ-কাঠামোর মতো।
শুরুতে এসব বাড়তি সংযোগ মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হতে থাকে মস্তিষ্কের সামনের অংশে- বিশেষত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে। এই অংশটিই চিন্তা করা, স্মৃতি কাজে লাগানো, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিচার-বিশ্লেষণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সামলায়। সোয়ানের পরামর্শ- মস্তিষ্কের এই বাড়তি সংযোগগুলো যতটা সম্ভব সচল রাখা এবং যা কিছু এদের কাজে বাধা দেয়, তা এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
যারা বেশি বয়সেও মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখতে পেরেছেন
বইটি লেখার সময় সোয়ান কথা বলেছেন এমন সাতজন মানুষের সাথে, যারা অনেক বেশি বয়সেও তাদের স্মৃতি ও চিন্তাশক্তি প্রায় অটুট রেখেছেন। তিনি তাদের বর্ণনা করেছেন ‘কগনিটিভ সুপার-এজার’ হিসেবে- যারা অসাধারণভাবে মস্তিষ্কের সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছেন।
তাদের জীবনযাপনের ধরন ছিল একেবারেই ভিন্ন ভিন্ন। এই দলে ছিলেন ৯৫ বছর বয়সী এক জুতা তৈরির কারিগর, যিনি কখনো পড়তে বা লিখতে শেখেননি। ছিলেন এমন এক নারী, যিনি একসময় রোলিং স্টোনসের প্রধান গায়ক মিক জ্যাগারকে পরিসংখ্যান পড়িয়েছেন। আবার জাপানের একটি ম্যাকডোনাল্ডসে ৯৪ বছর বয়সেও নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন- এমন একজন নারীও ছিলেন তালিকায়।

এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও একটা জায়গায় তাদের অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছেন সোয়ান- তারা প্রত্যেকেই মানসিক চাপ সামলাতে দারুণ দক্ষ। কোনো খারাপ ঘটনা ঘটলে তারা তা নিয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকেন না; বরং সমস্যার সমাধান খুঁজে নেন, তারপর সেটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যান।
সোয়ানের ব্যাখ্যায়, একই ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবতে থাকা মস্তিষ্কের সামনের অংশের অনেকটা শক্তি নিঃশেষ করে দেয়- ফলে অন্য জরুরি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি কমে আসে। তার মতে, বিষণ্নতা কিংবা অতিরিক্ত মদ্যপানের মতো অভ্যাসও মস্তিষ্কের সামনের অংশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা বয়সজনিত পরিবর্তনকে আগেভাগেই ডেকে আনতে পারে।
৪০-৫০ পেরোলেই মস্তিষ্কের যত্ন শুরু করা ভালো
সোয়ানের পরামর্শ, মস্তিষ্কের যত্নের বিষয়ে সচেতন হওয়া উচিত চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশের কোঠায় পা দেওয়ার পর থেকেই। তবে যে বয়স থেকেই শুরু করা হোক না কেন, উপকার মেলে ঠিকই- এটাও তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন।
তার প্রধান পরামর্শগুলোর একটি হলো নিয়মিত ব্যায়াম। শরীরচর্চা মস্তিষ্ককে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং নতুন সংযোগ গড়ে তুলতে সাহায্য করে- ফলে বয়স বাড়লেও মস্তিষ্ক থাকে সজীব ও সক্রিয়।
খাদ্যাভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়ার কথা বলেছেন সোয়ান। বেশি করে শাকসবজি- বিশেষত সবুজ পাতাযুক্ত সবজি, বেরি জাতীয় ফল আর দইয়ের মতো গাঁজন করা খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি, পাশাপাশি লাল মাংস কমানোর কথাও বলেছেন। তার ভাষায়, এসব খাবার অন্ত্রে থাকা উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য ঠিক রাখে, আর অন্ত্রের স্বাস্থ্যের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।
অলস সময়েও থেমে থাকে না মস্তিষ্ক
কোনো নির্দিষ্ট কাজে ব্যস্ত না থাকলেও মস্তিষ্ক কিন্তু পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। বরং এই সময়টাতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মস্তিষ্কের একটি বিশেষ নেটওয়ার্ক, যেখানে সাধারণত একসঙ্গে কাজ না করা অংশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়। মন যখন এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখনই এই প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকার আভাস মেলে।
সোয়ানের মতে, এভাবে মনের ঘুরে বেড়ানো মোটেই খারাপ কিছু নয়- বরং তা মস্তিষ্কের জন্য উপকারীই হতে পারে। অতীতকে মনে করা, বর্তমানকে বোঝা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কল্পনা করা- এই তিনটি বিষয়কেই তিনি সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তার ভাষ্যে, মধ্যবয়সী মানুষ এখানে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন- একদিকে জীবনভর জমানো অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার যথেষ্ট সময়ও হাতে থাকে।
বংশগতির চেয়ে জীবনযাপনই বেশি নির্ধারক?
সোয়ানের গবেষণা থেকে উঠে আসা সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয়টি হলো- মস্তিষ্ক কখন দুর্বল হতে শুরু করবে, তা শুধু বংশগতির ওপর নির্ভর করে না। কথা বলা সাতজনের জীবন পর্যালোচনা করে তিনি বুঝেছেন, মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করছেন এবং তার চারপাশের পরিবেশ কেমন- এসবই মস্তিষ্কের বয়সের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাতজনের মধ্যে মাত্র একজনের ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে- নিউ জার্সির একশ বছর বয়সী এক স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ। তবে তিনিও বসে থাকেননি; নিয়মিত মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখার নানা চর্চা চালিয়ে গেছেন। পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন, বিভিন্ন ক্লাসে অংশ নিতেন, পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন মানুষের সঙ্গেও গড়ে তুলেছিলেন বন্ধুত্ব। সোয়ানের কথায়, নতুন কিছু শেখা আর অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা- মস্তিষ্ক ভালো রাখার জন্য এ দুটোই অপরিহার্য।
গবেষণার প্রভাব নিজের জীবনেও
এই বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে নিজের জীবনযাপনেও বেশ কিছু বদল এনেছেন সোয়ান। তিনি এখন সচেতন থাকেন, কোনো বিষয় নিয়ে অযথা বেশি ভাবছেন কি না- আর মানসিক চাপের বিষয়ে পড়ে না থেকে সরাসরি সমাধানের পথ খোঁজেন। মদ্যপান কমিয়েছেন, কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো বিষয়েও এখন বাড়তি সতর্ক তিনি। খাবারের পাতে এখন বেশি জায়গা পায় সবুজ শাকসবজি, বেরি জাতীয় ফল আর দই। সঙ্গে চলে নিয়মিত মাঝারি থেকে ভারী মাত্রার ব্যায়ামও।

অবসর নেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই সোয়ানের। তার বিশ্বাস, অর্থপূর্ণ কোনো কাজে যুক্ত থাকা মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে ভালো।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ মস্তিষ্কের জন্য বিপজ্জনক
সোয়ানের মতে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ আর একই বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে থাকা- দুটোই মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। যদিও তিনি স্বীকার করেন, এই ধরনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্যই বেশ কঠিন। যারা নিজে থেকে এই সমস্যা সামলাতে পারছেন না, তাদের বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি- প্রশিক্ষিত ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানীর মাধ্যমে দেওয়া নির্দিষ্ট ধরনের জ্ঞানীয় আচরণগত থেরাপি ক্ষতিকর চিন্তার অভ্যাস বদলাতে বেশ কার্যকর হতে পারে।
অবসর নেওয়া যায়, নিষ্ক্রিয় হওয়া যায় না
দ্য ব্রেইন ক্লিফ বইয়ের একটি অধ্যায়ের নামই ‘অবসর নেবেন না’। তবে এর মানে এই নয় যে সবাইকে সারা জীবন একই চাকরিতে আটকে থাকতে হবে। সোয়ানের মূল বক্তব্য- চাকরি ছাড়ার পরও মানুষকে মানসিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকতেই হবে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু গবেষণায় দেখা গেছে অবসরের পর মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়ার গতি বেড়ে যেতে পারে। তবে শারীরিকভাবে কঠোর পরিশ্রমের কাজ করেন এমন অনেকের পক্ষে দীর্ঘদিন চাকরি চালিয়ে যাওয়া বাস্তবেই সম্ভব নয়- এ কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন সোয়ান। তাই তার কাছে আসল প্রশ্নটা হলো- চাকরি ছাড়ার পর মানুষ ঠিক কী নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন।
স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, নতুন কোনো শখ গড়ে তোলা, কঠিন কোনো দক্ষতা রপ্ত করা, কিংবা বুদ্ধির খেলা বা চিন্তাশক্তি প্রয়োজন হয় এমন কাজে যুক্ত থাকা- এসব কিছুই মস্তিষ্ককে সজীব রাখতে সাহায্য করে।
অর্থাৎ চাকরি থেকে অবসর নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সক্রিয় জীবন থেকে নয়। অবসর নিয়ে সারাদিন সোফায় বসে শুধু নেটফ্লিক্স দেখা মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার ভালো উপায় নয় বলেই মনে করেন সোয়ান।

