...|...|...

কৃষি ও প্রকৃতি

বিন্না ঘাস কী, কেন এর ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ২:৫৮ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৪৬
Shares
বিন্না ঘাস কী, কেন এর ব্যবহার বাড়াতে চায় সরকার

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে আগাছা বা অবহেলিত গুল্ম হিসেবে পরিচিত বিন্না ঘাস (ইংরেজি নাম: Vetiver) এখন জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং প্রাকৃতিকভাবে মাটি আঁকড়ে রাখার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে দেশের সড়ক, বাঁধ ও নদী তীর রক্ষা প্রকল্পে এই ঘাসের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এই ঘাসের উপযোগিতা যাচাই ও কর্মপরিকল্পনা তৈরির জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটিও গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে বিন্না ঘাস ব্যবহারের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

বিন্না ঘাস হলো একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা সাধারণত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঠঘাট, গ্রামীণ রাস্তাঘাট বা পরিত্যক্ত জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই জোপের মতো বেড়ে ওঠে। কোথাও এটি বেন্না, খসখস কিংবা ছন নামেও পরিচিত। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অবিশ্বাস্য রকমের লম্বা ও শক্ত শিকড়, যা মাটির প্রায় ৩ থেকে ৪ মিটার গভীরে প্রবেশ করে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের মতে, এই শিকড়গুলো কেবল মাটিকে আঁকড়েই ধরে না, বরং ভূমির স্তরগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে একসাথে সুরক্ষিত রাখে। এছাড়া তীব্র খরা, অতিরিক্ত ঠান্ডা কিংবা দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকার মতো চরম প্রতিকূল আবহাওয়াতেও এই ঘাস সহজে বেঁচে থাকতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রিন্সিপাল এক্সপেরিমেন্টাল অফিসার মোহাম্মদ আব্দুর রহিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেখতে সাধারণ হলেও বিন্না ঘাসের শিকড়ের কার্যকারিতা অসাধারণ। মাটির ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শিকড় ভূমিক্ষয় ঠেকাতে সহায়তা করে।

প্রায় দুই দশকের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই ঘাসের শেকড়গুলো অত্যন্ত লম্বা ও শক্তিশালী হয়। শেকড় দুই থেকে তিন মিটার কখনো কখনো চার মিটার পর্যন্ত মাটির ভেতর ভেদ করতে পারে।

সরকার কেন বিন্না ঘাসের ব্যবহার বাড়াতে চাইছে?

প্রকৃতিভিত্তিক ও সাশ্রয়ী উপায়ে দেশের অবকাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বিন্না ঘাসকে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মূল কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

স্বল্প ব্যয় ও সাশ্রয়ী সমাধান

বাঁধ বা সড়ক রক্ষায় সাধারণত রড, সিমেন্ট, জিও ব্যাগ বা কনক্রিটের ব্লকের মতো ব্যয়বহুল উপকরণের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কংক্রিটের কাজের তুলনায় বিন্না ঘাস ব্যবহার করে অত্যন্ত কম খরচে অনেক বেশি টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রাকৃতিক উপায়ে ভাঙন রোধ

দেশের পাহাড়ি অঞ্চলগুলো (যেমন—বান্দরবান, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম) এবং নদী ও খালের পাড় প্রায়শই ভূমিধস বা ভাঙনের শিকার হয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার দেশব্যাপী যে ব্যাপক খাল খনন ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, বৃষ্টির মৌসুমে তা ভরাট বা ধসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই খালের পাড় ও বাঁধ রক্ষায় বিন্না ঘাস অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা

এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি। ভারী বর্ষণ বা পাহাড়ি ঢলে মাটির ক্ষয়রোধ করার পাশাপাশি এটি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করে।

বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে রূপরেখা তৈরি

বিন্না ঘাসের কার্যকারিতা যাচাই ও এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায় টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি দেশের কোন কোন প্রকল্পে (বিশেষ করে সড়ক ও জনপথ, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর বা এলজিইডি-র অধীনে) এই ঘাস রোপণ করা যায়, তার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা গাইডলাইন তৈরি করবে।

কেন এই উদ্যোগ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁধ কিংবা সড়ক সুরক্ষায় ঐতিহ্যগতভাবে রড, সিমেন্ট, জিও ব্যাগ বা কংক্রিটের ব্লকের মতো ব্যয়বহুল উপকরণের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ এর বিপরীতে বিন্না ঘাস ব্যবহার করে অত্যন্ত কম খরচে অনেক বেশি টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।

বিন্না ঘাস মূলত একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ, যা প্রতিকূল আবহাওয়াতেও সহজে বেঁচে থাকে। এর সবচেয়ে বড় জাদুকরী বৈশিষ্ট্য হলো এর অবিশ্বাস্য লম্বা ও শক্তিশালী শিকড়। রোপণের মাত্র চার থেকে ছয় মাসের মধ্যেই এর শিকড় মাটির দুই থেকে তিন মিটার (কখনও চার মিটার পর্যন্ত) গভীরে প্রবেশ করে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মাটির স্তরগুলো প্রাকৃতিকভাবে একসাথে সুরক্ষিত থাকে, যা পাহাড়ি অঞ্চলের ভূমিধস ও নদীতীরবর্তী ভাঙন রোধে অত্যন্ত কার্যকর।