...|...|...

কৃষি ও প্রকৃতি

ইনানী বনে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিলল

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৪৮ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৫১
Shares
ইনানী বনে বিপন্ন মেঘলা চিতাসহ আরও যেসব প্রাণীর দেখা মিলল

ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের ইনানী জাতীয় উদ্যানে সম্প্রতি পরিচালিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় মেঘলা চিতা ও পশ্চিমের উল্লুক গিবনের মতো চরম সংকটাপন্ন প্রাণীসহ মোট ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর সন্ধান মিলেছে। 

উপকূলীয় ও পাহাড়ি বনাঞ্চলের অনন্য মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা ৭ হাজার ৮৫ হেক্টরের এই সংরক্ষিত বনে বিড়াল গোত্রের অত্যন্ত বিরল ও বিপন্ন প্রাণী ‘ক্লাউডেড লেপার্ড’ বা মেঘলা চিতার ক্যামেরায় ধরা পড়ার ঘটনা দেশের বন্যপ্রাণী গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।

বাংলাদেশ বন অধিদফতরের ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টারের পরিচালক ও গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া যায়।

পুরো উদ্যানকে ১১টি জোনে ভাগ করে ক্যামেরা ট্র্যাপ, লাইন ট্রানসেক্ট এবং পরোক্ষ চিহ্ন বা স্পটিং পদ্ধতির মতো আধুনিক কৌশল ব্যবহার করা হয়। বনের ৩২টি স্থানে ক্যামেরা স্থাপন ছাড়াও প্রাণীর পায়ের ছাপ, বিষ্টা, গাছের আঁচড় এবং সরাসরি আওয়াজ শুনে প্রজাতিগুলো নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা হয়।

শুধু স্তন্যপায়ী প্রাণীই নয়, গবেষণায় উদ্যানের ৬৬ প্রজাতির গাছ এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের সার্বিক পরিস্থিতিও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে।

গবেষণায় মেঘলা চিতা ও উল্লুক ছাড়াও শনাক্ত হওয়া ২৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকায় রয়েছে- এশিয়ান হাতি, মায়া হরিণ, বনশূকর, লাল বানর, মুখপোড়া হনুমান এবং বড় বাঘডাশ। এ ছাড়া মেছো বিড়াল, লেপার্ড ক্যাট, কাঁকড়াভুক বেজি, গন্ধগোকুল, ছোট গন্ধগোকুল, সোনালি শিয়াল, মালয় শজারু, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, লার্জ-টুথড ফেরেট ব্যাজার এবং গেছো ছুঁচোর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক বন যে এলাকায় বেশি ঘন ও সুরক্ষিত, সেখানে বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য ও উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সমৃদ্ধ।

ইনানী জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতা বা ক্লাউডেড লেপার্ডের উপস্থিতি গবেষকদের সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে। অতীতে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এর নাম শোনা গেলেও কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ক্যামেরায় বন্দি হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।

প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট (আইইউসিএন)-এর লাল তালিকা অনুযায়ী- বিশ্বজুড়ে সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশে অত্যন্ত বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত এই প্রাণীটির ৫টি ছবি ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে এবং ১৩টি ক্ষেত্রে পায়ের ছাপ বা বিষ্টার মতো আলামত পাওয়া গেছে।

শক্তিশালী থাবা ও নমনীয় গোড়ালির অধিকারী এই প্রাণীটি গাছের খাড়া কাণ্ড বেয়ে মাথা নিচের দিকে রেখে অনায়াসে নামতে পারে এবং দিনের বেশিরভাগ সময় গাছেই কাটায়।

কক্সবাজারের ইনানী থেকে উখিয়ার শিলখালি পর্যন্ত বিস্তৃত এই বনাঞ্চল শুধু স্থানীয়ভাবে নয়, বরং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বনের সংযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে কাজ করে। তবে এই সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য বর্তমানে মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে।

গবেষক বিপুল কৃষ্ণ দাস বলেন, কেবল স্তন্যপায়ী প্রাণীই নয়- বৃক্ষ এবং আশপাশের জনবসতি তথা ওই বনাঞ্চলের সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের অবস্থাই গবেষণার মাধ্যমে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি। তার মতে, মানুষের নানা কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়তই বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যে বড়ো ধরনের প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, বনের ৩২টি স্থানে ক্যামেরা, সরাসরি দেখা ও আওয়াজ শুনে শনাক্ত এবং বিষ্ঠা, পায়ের ছাপ, গাছের আঁচড় বিশ্লেষণ করে শনাক্তের কাজটি করা হয়েছে।

এছাড়া উদ্যানের বৃক্ষ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি আশেপাশে বসবাসরত প্রায় ৩০০ মানুষের সাথে কথা বলে, সেখানকার সমগ্র বাস্তুতন্ত্র কী অবস্থায় রয়েছে, সেটিও দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি।

বনের সুরক্ষায় বড় কয়েকটি হুমকির কথা তুলে ধরেছেন বিপুল কৃষ্ণ দাস । এর মধ্যে রয়েছে- বিপুল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ও স্থানীয় জনসংখ্যার চাপ, বনের মাঝ দিয়ে অপরিকল্পিত রাস্তা তৈরি যা এশিয়ান হাতির চলাচলের করিডোর ভেঙে দিচ্ছে, নির্বিচারে পাহাড় কেটে ঘর ও গাছ কেটে ফসল ফলানো, অবৈধ শিকার এবং প্রভাবশালী মহলের অন্যায় দখল।

আইইউসিএন-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩৯০টি বন্য প্রাণী বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি প্রজাতি মহাবিপন্ন এবং ১৮১টি বিপন্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান মনে করেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাগজে-কলমে উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে জনবল সংকট ও পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব রয়েছে। সুন্দরবনের পাশাপাশি অন্যান্য সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও যদি সমানভাবে নজর দেওয়া হতো, তবে অনেক বিপন্ন প্রাণীই ঝুঁকিমুক্ত হতে পারত।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খাদ্যচক্রের প্রতিটি প্রাণীর গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনানীর এই ৭ হাজার ৮৫ হেক্টরের বন প্রমাণ করেছে মানুষের শত চাপের মধ্যেও প্রকৃতি লড়াই করে বেঁচে থাকতে চায়। বন্যপ্রাণীর এই আবাসের মানোন্নয়ন এবং বিপন্ন প্রজাতিগুলোর বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা ও কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।