...|...|...

কৃষি ও প্রকৃতি

বরগুনায় বিরল বিষধর দাগী লেজা সবুজ বোড়া সাপ উদ্ধার

বরগুনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০:০৭ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:২৩
Shares
বরগুনায় বিরল বিষধর দাগী লেজা সবুজ বোড়া সাপ উদ্ধার

ছবি: সংগৃহীত

বরগুনার তালতলী উপজেলায় বিরল বিষধর সাপ স্পট-টেইলড গ্রিন পিট ভাইপার বা দাগী লেজা সবুজ বোড়া উদ্ধার করেছে স্বেচ্ছাসেবী প্রাণিকল্যাণ পরিবেশবাদী সংগঠন অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী। সংগঠনটির দাবি, বরগুনায় প্রজাতির সাপ উদ্ধারের ঘটনা তাদের জন্য প্রথম।

শনিবার ( সেপ্টেম্বর) তালতলী উপজেলার সোনাকাটা গ্রাম থেকে একটি Spot-tailed Green Pit Viper উদ্ধার করেন সংগঠনের সাপ বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মী এবং তথ্য প্রচার সম্পাদক কাওসার ওরফে হৃদয়। পরে সাপটিকে নিরাপদে টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হয়।

অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালীর পরিচালক আসাদুল্লাহ হাসান মুসা বলেন, স্পট-টেইলড পিট ভাইপার বা রেড-টেইলড পিট ভাইপার- যার বৈজ্ঞানিক নাম Trimeresurus erythrurus- বাংলাদেশে পাওয়া একটি বিষধর গেছো সাপ। স্থানীয়ভাবে এটি দাগী লেজা সবুজ বোড়া, সবুজ বোড়া, টিয়া বোড়া বা গেছো বোড়া নামেও পরিচিত।

তিনি বলেন, পিট ভাইপারদের নাকের সামনে তাপ সংবেদনশীল বিশেষ ছিদ্র থাকে, যাকে পিট অর্গান বলা হয়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই এদের পিট ভাইপার বলা হয়। এদের মাথা ত্রিকোণাকৃতির কিছুটা চ্যাপ্টা এবং মাথার দুই পাশে থাকা পিট অর্গান এদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

আসাদুল্লাহ হাসান মুসা জানান, স্পট-টেইলড পিট ভাইপার মূলত নিশাচর গেছো স্বভাবের। দিনের তুলনায় রাতে এরা বেশি সক্রিয় থাকে। সাধারণত গাছপালা, ঝোপঝাড় বনাঞ্চলে এদের দেখা যায়। বাংলাদেশের পাহাড়ি বনভূমিতে এদের বেশি দেখা গেলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও প্রজাতির উপস্থিতির রেকর্ড রয়েছে। সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম সুন্দরবনের পাশাপাশি পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা পিরোজপুরেও সাপের উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পূর্ণবয়স্ক একটি পিট ভাইপার সাধারণত প্রায় দুই ফুট লম্বা হয় এবং সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এরা ডিম পাড়ার পরিবর্তে সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে প্রজনন করে এবং প্রায় পাঁচ মাস পর বাচ্চা প্রসব করে। একটি পিট ভাইপার একসাথে প্রায় ১০ থেকে ২০টি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করতে পারে।

লেজে স্পট, পেটেও সাদা দাগ

স্পট-টেইলড পিট ভাইপারকে চেনার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আসাদুল্লাহ হাসান মুসা বলেন, এদের লেজে হলুদ বা লালচে স্পট থাকে। পেটের নিচের অংশ বা ভেন্ট্রাল অংশেও তুলনামূলক বড় সাদা স্পট দেখা যায়। এসব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে অন্যান্য সবুজ গেছো সাপ থেকে দাগী লেজা সবুজ বোড়াকে শনাক্ত করা যায়।

সাপের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে তিনি বলেন, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, উভচর প্রাণী ইঁদুরসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণী এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে। প্রকৃতিতে এরা খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ইঁদুরসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

বিষধর হলেও সাধারণত মানুষকে তাড়া করে না

পিট ভাইপারের বিষ সম্পর্কে তিনি বলেন, এদের বিষ মূলত হেমোটক্সিক প্রকৃতির। কামড়ের পর আক্রান্ত স্থানে তীব্র ব্যথা, ফোলাভাব টিস্যুর ক্ষতি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে আক্রান্ত স্থান কালচে হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে বিষের প্রভাব কামড়ের স্থান, বিষের পরিমাণ আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

তিনি বলেন, স্পট-টেইলড পিট ভাইপার সাধারণত মানুষকে তাড়া করে আক্রমণ করে না। গাছে থাকা অবস্থায় অসাবধানতাবশত খুব কাছে চলে গেলে, ধরার চেষ্টা করলে কিংবা বিরক্ত করলে আত্মরক্ষার্থে কামড় দিতে পারে। তাই ধরনের সাপ দেখলে আতঙ্কিত হয়ে হত্যা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নেওয়া উচিত।

সাপে কাটলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ

সাপের কামড়ের চিকিৎসা সম্পর্কে আসাদুল্লাহ হাসান মুসা বলেন, পিট ভাইপারের কামড়কে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। কামড়ের পর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। ঝাড়ফুঁক, কবিরাজি চিকিৎসা কিংবা কোনো ধরনের ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।

তিনি বলেন, দাগী লেজা সবুজ বোড়া বিষধর হলেও প্রকৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সাপ। বরগুনায় প্রজাতির সাপ তুলনামূলকভাবে বিরল। অ্যানিমেল লাভার্স অব পটুয়াখালী বরগুনায় প্রথমবারের মতো প্রজাতির একটি সাপ উদ্ধার করেছে। অকারণে সাপ হত্যা না করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও সবাইকে সচেতন হতে হবে।