...|...|...

কৃষি ও প্রকৃতি

গুইসাপ ধরা ও হত্যায় যে সাজা হতে পারে

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১১:৩৩ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:২৯
Shares
গুইসাপ ধরা ও হত্যায় যে সাজা হতে পারে

ছবি: সংগৃহীত

খাগড়াছড়ি সদর থেকে বস্তাবন্দী অবস্থায় ২৪টি গুইসাপ উদ্ধারের ঘটনাটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ও বন বিভাগের যৌথ অভিযানে এক নারীর কাছ থেকে এই গুইসাপগুলো উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে ১৪টিই মারা গিয়েছিল। 

এই ঘটনায় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ঘটনার রেশ ধরে প্রশ্ন উঠেছে—পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুইসাপের ভূমিকা কী এবং আইন অনুযায়ী এগুলোর শিকার বা হত্যার শাস্তি কী?

কেন ধরা হয়েছিল গুইসাপগুলো?

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে খাগড়াছড়ি সদরের চেঙ্গিস স্কয়ারে অভিযান চালিয়ে ফেনী থেকে নিয়ে আসা গুইসাপগুলো উদ্ধার করা হয়। পানছড়ি উপজেলার কুরাদিয়া ছড়া গ্রামের ওই নারী বিক্রির উদ্দেশ্যে গুইসাপগুলো সংগ্রহ করেছিলেন। স্থানীয় লোকালয়ে গুইসাপের মাংস খাওয়ার প্রবণতা থাকায় মূলত খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্যই এগুলোর অবৈধ বাণিজ্য চলছিল। উদ্ধারকৃত জীবিত ১০টি গুইসাপকে আলুটিলার প্রাকৃতিক বনে অবমুক্ত করা হয়েছে এবং মৃত ১৪টি গুইসাপকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।

গুইসাপ কি বিরল প্রাণী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, গুইসাপ বিরল কোনো প্রাণী নয়। নামের সাথে ‘সাপ’ শব্দটি থাকলেও এটি মূলত টিকটিকি জাতীয় সরীসৃপ প্রাণী, যা ইংরেজিতে ‘মনিটর লিজার্ড’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রধানত তিন প্রজাতির গুইসাপ দেখা যায়:

  • বেঙ্গল মনিটর লিজার্ড (বাঙালি গুইসাপ): এটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রজাতি এবং দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। তিন প্রজাতির মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়, যা লম্বায় প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত হতে পারে। মুরগির বাচ্চা বা ছোট প্রাণী শিকার করায় অনেক সময় গ্রামের মানুষ এদের মেরে ফেলে।
  • ইয়েলো মনিটর লিজার্ড (সোনা গুইসাপ): জলাভূমি ও সমতল ভূমিতে এই হলুদ-বাদামি রঙের গুইসাপ সচরাচর দেখা যায়। একটি পূর্ণবয়স্ক সোনা গুই প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়।
  • ভারানাস সালভাটর (কালো গুইসাপ): সুন্দরবন, লবণাক্ত এলাকা, কাপ্তাই লেক এবং দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। দক্ষ সাঁতারু এই প্রজাতিটি গাছেও উঠতে পারে এবং লম্বায় প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত হয়।

পরিবেশ রক্ষায় গুইসাপের গুরুত্ব

পরিবেশবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের বিবিসি বাংলাকে জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুইসাপের ভূমিকা অপরিসীম। বিষধর সাপ, ক্ষতিকর পোকামাকড় ও ইঁদুর খেয়ে এরা খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখে এবং ফসলের ফলন বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া মৃত জীবজন্তু খেয়ে এরা প্রকৃতি পরিচ্ছন্ন রাখে। কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে প্রকৃতিকে বাঁচাতে এই নিরীহ প্রাণীগুলোর উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি।

বন্যপ্রাণী আইনে শাস্তি ও বিধান

প্রকৃতি থেকে বন্যপ্রাণী ধরা, আটক করা বা হত্যা করা বাংলাদেশের আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বন্যপ্রাণীর প্রতি আঘাত করা, উত্ত্যক্ত করা, চোখ বেঁধে রাখা, অপ্রয়োজনে আটক রাখা কিংবা পরিবহনের সময় কষ্ট দেওয়ার মতো যেকোনো নিষ্ঠুর আচরণও এই আইনের লঙ্ঘন। অপরাধের ধরন অনুযায়ী এই আইনে সর্বনিম্ন ছয় মাস থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এছাড়া একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।