গত মার্চে সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন পাসের পর এবার নতুন একটি ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণে হাত দিয়েছে ইসরায়েল। বিশেষত্ব হলো, এই মঞ্চে দণ্ডপ্রাপ্তদের পরিবার যাতে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার দৃশ্য সরাসরি দেখতে পারেন, সে জন্য রাখা হয়েছে আলাদা দর্শক-বুথ। আইনটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে কার্যত কেবল ফিলিস্তিনিরাই এই আইনের আওতায় পড়ে ফাঁসির মুখোমুখি হতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক, জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির নিজেই একটি ভিডিওতে এই নির্মাণকাজ নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন। ১৮ আগস্ট প্রকাশিত ওই ভিডিওতে তার কট্টরপন্থি ওতজমা ইয়েহুদিত পার্টির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে জানানো হয়, মধ্য ইসরায়েলের একটি কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মিত মৃত্যুদণ্ড-ওয়ার্ডের সঙ্গেই যুক্ত থাকছে এই ফাঁসির মঞ্চ।
যুক্তরাষ্ট্রের মতোই ব্যবস্থা
ভিডিওতে নির্মাণাধীন স্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বেন-গ্যভির দাবি করেন, তিনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তার সবটাই বাস্তবায়ন করছেন- কারাগারে সন্ত্রাসীদের অবস্থা আরও কঠোর করা, মৃত্যুদণ্ড আইন পাস করা, আর এখন ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা। তিনি জানান, দণ্ডপ্রাপ্তদের ফাঁসি কার্যকরের সময় ভুক্তভোগীদের স্বজনরা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের রীতি অনুসরণ করে সরাসরি সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে পারবেন নির্ধারিত বুথ থেকে। এই সুবিধা পেতে শোকাহত পরিবারগুলোকে দেওয়া হবে বিশেষ প্রবেশ-অনুমতিও।
মার্চে নেসেটে পাস হওয়া ‘সন্ত্রাসীদের জন্য মৃত্যুদণ্ড আইন’-এর মাধ্যমে সামরিক আদালতগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু সন্ত্রাস-সম্পর্কিত অপরাধে মৃত্যুদণ্ডকে একমাত্র শাস্তি হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, আইনটির শর্ত এমনভাবে সাজানো যে এটি কার্যত ইহুদি ইসরায়েলিদের আওতার বাইরে রাখে, কারণ এতে কেবল ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকারের উদ্দেশ্যে’ সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকেই প্রযোজ্য বলা হয়েছে। এই আইনের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ সম্প্রসারণকারী হাতে গোনা কয়েকটি গণতান্ত্রিক দেশের একটিতে পরিণত হয়েছে ইসরায়েল।
জাতিসংঘের কড়া প্রতিক্রিয়া
বেন-গ্যভিরের এই ঘোষণার পর কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এক ব্রিফিংয়ে বলেন, এই ধরনের মন্তব্য স্তম্ভিত করার মতো, অমানবিক এবং বিপজ্জনক, আর তারা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনের আগে নিজের কট্টরপন্থি ভোটব্যাংককে চাঙা রাখতেই এই ধরনের প্রচারণামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন বেন-গ্যভির, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে কঠোরতর ব্যবস্থার পক্ষে সোচ্চার।
বিতর্কিত অতীত রেকর্ড
উগ্র ইহুদি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের অনুসারী বেন-গ্যভির দীর্ঘদিন ইসরায়েলি রাজনীতির প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর তাঁর জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২২ সাল থেকে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন।
গত মে মাসে নিজের ৫০তম জন্মদিনে ফাঁসির দড়ির নকশা করা কেক কেটে আলোচনায় আসেন তিনি। একই মাসে গাজায় আটক ত্রাণকর্মীদের হাত বাঁধা অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসিয়ে রাখার একটি ভিডিওও প্রকাশ করেছিলেন তিনি, যা আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি ত্রাণবাহী বহরকে আটকের পর ধারণ করা হয়। এ ছাড়া গত ১৬ আগস্ট এক পডকাস্টে গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যার প্রস্তাব দেন তিনি, পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের গণহারে গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ারও প্রস্তাব করেন।
তার নিয়ন্ত্রণাধীন কারাগারগুলোয় ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি নানা নির্যাতনের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এসব কর্মকাণ্ডের জেরে গত বছর ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য বেন-গ্যভিরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল, দ্য জেরুজালেম পোস্ট, আরব নিউজ

