সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার হওয়া মৌলভীবাজারের বড়লেখার এনামুল আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবীর প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে কারাগারে। দীর্ঘ এই সময়ে তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। অথচ দীর্ঘ কারাবাসে এখন মানসিক ভারসাম্যও হারিয়েছেন তিনি।
পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এনামুল আহমেদের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ এপ্রিল কাশিমপুর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এনামুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তিনি প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি এবং এলোমেলো কথাবার্তা বলছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন বন্দী থাকার কারণে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। বর্তমানে তাকে আলাদা ওয়ার্ডে রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তাপ্রহরী থেকে সন্দেহভাজন আসামি
এনামুল হক ওরফে হুমায়ুন কবীর মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মৃত মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়া।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ নম্বর ভবন থেকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির লাশ উদ্ধারের পর সন্দেহভাজন হিসেবে এনামুলকে গ্রেফতার করে র্যাব। হত্যাকাণ্ডের সময় ওই ভবনে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করতেন তিনি।
এরপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে ১৩ বছর। কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি বলে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ছেলের মুক্তির আকুতি মায়ের
এনামুলের মা ফাতেমা বেগম ছেলের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ছেলে দোষী হলে তিনি তার বিচারই চেয়েছিলেন। কিন্তু সাড়ে ১৩ বছরেও যদি কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তাকে আর কারাগারে রাখা উচিত নয়।’
ফাতেমা বেগম বলেন, ‘টেলিভিশনের খবরের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন, পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে এনামুলের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।’ তার দাবি, ছেলেকে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ কারাবাসে নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবনের জন্য ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, এনামুলকে গ্রেফতারের আগে ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তার স্বামী কালা মিয়াকেও র্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ২১ দিন পর ভৈরবের কাছে তাকে ফেলে যাওয়া হয়। বাড়িতে ফিরে কালা মিয়া নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শকের কথা জানিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। প্রায় ছয়-সাত মাস আগে তার মৃত্যু হয়।
আর্থিক সংকটে পরিবার
এনামুলের বড় ভাই শাহিন আহমদ বলেন, ‘ভাই গ্রেফতারের পর থেকেই তাদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে মামলাটিও ঠিকমতো পরিচালনা করতে পারেননি তারা।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে তার ভাই কারাগারে রয়েছেন। এখন যদি তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলা হয়, তাহলে দ্রুত তাকে মুক্তি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।’
১৩ বছরেও শেষ হয়নি সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা থেকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির লাশ উদ্ধার করা হয়। আলোচিত এ হত্যা মামলার তদন্ত প্রথমে থানা পুলিশ, পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং এরপর র্যাবের কাছে যায়।
র্যাব দীর্ঘ সময়ে ১২৯ বার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নিয়েও তা দিতে পারেনি। বর্তমানে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্সের আওতায় মামলাটির তদন্ত করছে পিবিআই।
এদিকে, আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে একজন মানুষকে এত দীর্ঘ সময় কারাগারে রাখা গুরুতর মানবাধিকার প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে তদন্তকারী সংস্থার প্রতিবেদনে যদি তার বিরুদ্ধে অপরাধের সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকার কথা বলা হয়, তাহলে তার মুক্তি ও সুচিকিৎসার বিষয়টি দ্রুত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এনামুলের পরিবারের দাবি—তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে, সাগর-রুনি হত্যার অপবাদ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে এবং দীর্ঘ কারাবাসে নষ্ট হওয়া জীবনের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি তার দ্রুত মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও চান তারা।
সাড়ে ১৩ বছর ধরে কারাগারে থাকা এনামুলের ঘটনা তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে একজন মানুষকে আর কতদিন বন্দী থাকতে হবে?


