...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রভাবশালী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি ওয়াসা, ঘানি টানছে সাধারণ গ্রাহক

প্রভাবশালী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি ওয়াসা, ঘানি টানছে সাধারণ গ্রাহক

Times Today
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ভোর রাত ৫:৫১ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৫:১৭
Shares
প্রভাবশালী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি ওয়াসা, ঘানি টানছে সাধারণ গ্রাহক

ঢাকা ওয়াসার (ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথরিটি) আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বকেয়া আদায় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।  সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে,  গ্রাহকদের কাছ থেকে সংস্থাটির বিপুল অঙ্কের পাওনা দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে, যা সংস্থার আর্থিক স্থিতিশীলতা, নগদ প্রবাহ এবং ভবিষ্যৎ সেবা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।  আর এসব বকেয়ার বেশিরভাগই রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী শিল্প মালিকদের কাছে। বছরের পর বছর বকেয়া পড়ে থাকলেও তা আদায় করতে পারছে না ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। অথচ বিগত বছরগুলোতে বার বার পানির দাম বাড়িয়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপ তৈরি করেছে সংস্থাটি। অর্থাৎ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী শিল্প মালিকদের কাছে জিম্মি ওয়াসা যেন সাধারণ গ্রাহকদের দিয়ে ঘানি টানাচ্ছে।  

রাজধানী ঢাকায় পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা ঢাকা ওয়াসা বর্তমানে প্রায় ২ কোটি মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করছে,  যা প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার নিবন্ধিত গ্রাহক সংযোগের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।  বর্তমানে ওয়াসার দৈনিক পানি উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ২৭৫ কোটি লিটার।  তবে দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত চাপে সংস্থাটির ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমেই বাড়ছে। এর মাঝেই আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে।

শত শত কোটি টাকা বকেয়া

সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে,  বিগত কয়েক বছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে ওয়াসার পাওনা জমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫৫ কোটি টাকা,  যার একটি বড় অংশ বছরের পর বছর ধরে অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।  এর মধ্যে প্রায় ১৯৬ কোটি টাকা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আদায় হয়নি।

সম্প্রতি প্রকাশিত, ২০২৪ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক বিবরণীর ওপর পরিচালিত স্বাধীন অডিট প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক Nexia International-এর সদস্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড পার্টনার্স এই অডিট সম্পন্ন করে।

অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে,  এই বকেয়া মূলত পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সেবার বিপরীতে বাসাবাড়ি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা এবং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছে জমা রয়েছে।  দীর্ঘ সময় ধরে আদায় না হওয়ায় এর একটি বড় অংশ আদায়যোগ্যতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বকেয়ার বড় অংশ বাকি

ঢাকা ওয়াসার বিপুল এই বকেয়ার অধিকাংশই বিভিন্ন শ্রেণির বড় গ্রাহকদের কাছে আটকে আছে।  এর মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, বড় শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক সংস্থা এবং আবাসিক এলাকার কিছু উচ্চ আয়ের গ্রাহক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সাধারণ গৃহস্থালি গ্রাহকদের তুলনায় বড় অঙ্কের বকেয়া মূলত সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বেশি জমেছে।  দীর্ঘদিন ধরে এসব বকেয়া অনাদায়ী থাকায় মোট পাওনার একটি বড় অংশ স্থবির অবস্থায় রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও বড় গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বকেয়া আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে না পারায় বছরের পর বছর ধরে এই পাওনা জমতে জমতে এখন তা বড় আর্থিক চাপে পরিণত হয়েছে।  এর মধ্যে দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশনের কাছেও প্রায় ৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বলে অডিট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়

একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমস টুডেকে বলেন, বড় গ্রাহকদের কাছেই মূল বকেয়া জমে আছে।  অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলও দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী রয়েছে, যা আদায়ে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়।  আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে চাইতে গেলে নানা সমস্যা দেখা যায়।

প্রভিশন নীতি ও আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন

অডিটে আরও দেখা যায়, এই বিপুল বকেয়ার বিপরীতে ওয়াসা মাত্র ৫ শতাংশ প্রভিশন রেখেছে।  IFRS 9 (ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড ৯) অনুযায়ী,  অনিশ্চিত পাওনার বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা প্রয়োজন হলেও বর্তমান হার সম্ভাব্য ঝুঁকির তুলনায় কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অডিট পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া আদায়ে কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় কিছু পাওনা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।  এর ফলে ভবিষ্যতে হঠাৎ করেই বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বকেয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।  এতে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ তদারকি, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।

ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন টাইমস টুডেকে অডিটে উল্লিখিত বকেয়ার বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি।  তিনি বলেন, বাকি আছে।  তবে কত বাকি নির্দিষ্ট করে বলতে পারছি না। 

ওয়াসার রাজস্ব কর্মকর্তা ও জোনাল প্রধান রফিকুল ইসলাম টাইমস টুডেকে বলেন,  এ বিষয়ে কিছু জানি না।  তবে প্রতিবেদনটি দেখালে বলতে পারবো।  আপনি সাক্ষাতে ওটা দিলে আমি দেখতে পারি।  মূলত আমার এখানে কার্যক্রম খুব কম।  প্রত্যেক বিষয় অবগত থাকা অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। 

অর্থনৈতিক প্রভাব ও সেবার সক্ষমতায় ঝুঁকি 

বিশেষজ্ঞদের মতে,  দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের বকেয়া অনাদায়ী থাকলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায় না,  বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।  নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হলে ওয়াসার মতো সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ,  উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প ব্যাহত হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সেবার মান ও সরবরাহ সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান টাইমস টুডেকে বলেন,  দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের বকেয়া অনাদায়ী থাকলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায় না, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।  নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হলে ওয়াসার মতো সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে,  যা শেষ পর্যন্ত সেবার মানকে প্রভাবিত করে।

তিনি আরও বলেন,  আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন না রাখলে ভবিষ্যতে হঠাৎ বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে,  যা প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এই বিশেষজ্ঞের মতে,  বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই আর্থিক চাপ আরও বাড়বে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সংস্থাটির সেবা সক্ষমতার ওপর।

অডিট প্রতিবেদনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ মিলিয়ে দেখা যায়,  ওয়াসার সামনে একদিকে রয়েছে বিপুল বকেয়া আদায়ের চ্যালেঞ্জ,  অন্যদিকে আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।  বড় অঙ্কের অনাদায়ী পাওনা,  সীমিত প্রভিশন এবং দুর্বল আদায় ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে সংস্থাটির ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।