দুর্গম পাহাড়ি পথ। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি অদম্য আগ্রহ। এমন বাস্তবতায় রাঙামাটির লংগদু উপজেলার রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে সাফল্যের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে দুজন পেয়েছে গোল্ডেন এ প্লাস।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে যেখানে দুর্গমতা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে ওঠানামা দেখা যায়, সেখানে রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক সাফল্য আলাদা করে নজর কেড়েছে। শুধু এবারই নয়, গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানটি ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষার মান ও ফলাফলের দিক দিয়ে লংগদুতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিবছরই ভালো ফলাফল করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
এবার জিপিএ-৫ পাওয়া পাঁচ শিক্ষার্থী হলেন—বিজ্ঞান বিভাগের দেওয়ান নাসিফ মামুন বোরহান, আতিকা আলিম রাইসা, লাম্মী গিয়াস সাবা, ফাতেমা তুজ জান্নাত চৌধুরী ও চৌধুরী রাকিব উদ্দিন। তাদের মধ্যে আতিকা আলিম রাইসা ও নাসিব মামুন বোরহান গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করেছে।
সাফল্যের এই ধারাবাহিকতা অবশ্য এক বছরের নয়। বিদ্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৫ জন, ২০২৪ সালে ৫জন, ২০২৩ সালে ১০ জন, ২০২২ সালে ৯ জন, ২০২১ সালে ৬ জন এবং ২০২০ সালে ৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল।
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের কাছে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের সহযোগিতা এবং পরিবারের অনুপ্রেরণা।
তারা জানান, বাবা-মা ও শিক্ষকদের পরিশ্রমের কারণেই তাদের এই ফলাফল। তারা কোনো ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা মডেল টেস্ট বাদ দেননি। নিয়মিত পড়াশোনা ও চর্চার কারণেই পরীক্ষার প্রস্তুতি ভালো হয়েছে। ফল প্রকাশের পর কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পেয়ে তারা আনন্দিত এবং মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছেন।
গোল্ডেন এ প্লাস পাওয়া শিক্ষার্থী আতিকা আলিম রাইসার বাবা আব্দুল আলিম নিজেও একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মেয়ের সাফল্যে আনন্দিত এই বাবা বলেন, তার মেয়ের সাফল্যের পেছনে একনিষ্ঠ অধ্যবসায়ের পাশাপাশি শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টা রয়েছে। মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্যের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।
বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্বশীলরা বলছেন, প্রত্যন্ত এলাকায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তাদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে চারটি পক্ষের সমন্বয় জরুরি—পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে এই চার পক্ষ পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করায় ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আল-মামুন ইবনে মিজান বলেন, ‘ভালো ফলাফলের মূলমন্ত্র হচ্ছে পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয়। রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে সেই সমন্বয় বরাবরই শক্তিশালী। শিক্ষকদের পরিশ্রম, শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়, অভিভাবকদের সহযোগিতা এবং সময়োপযোগী দিকনির্দেশনার কারণেই ফলাফল ভালো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি শুধু একাডেমিক ফলাফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সহশিক্ষা কার্যক্রমেও জেলা, বিভাগ, উপাঞ্চল ও জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সাফল্য অর্জন করে আসছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ, বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাব্বির মীর ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২৬’র সাঁতার ইভেন্টে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে।’
দুর্গম পাহাড়ের এই বিদ্যালয়ের সাফল্যের গল্প তাই শুধু পাঁচটি জিপিএ-৫-এর হিসাব নয়। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং মানসম্মত শিক্ষার অঙ্গীকার থাকলে প্রত্যন্ত জনপদ থেকেও যে সাফল্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব—রাবেতা মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ধারাবাহিক ফলাফল তারই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।


