চোখে দৃষ্টিশক্তি নেই, কিন্তু স্বপ্ন দেখার অদম্য শক্তি রয়েছে। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করেও থেমে যাননি বান্দরবানের তরুণ মোহাম্মদ ইমতিয়াজুল ইসলাম। দৃষ্টিহীনতাকে জয় করে এবার উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৫০ অর্জন করেছেন তিনি। বান্দরবান সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে তার এই সাফল্য শুধু ভালো ফলাফল নয়, বরং অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও মায়ের নিরলস ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ।
জন্মের পর স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি নিয়েই বেড়ে উঠছিলেন ইমতিয়াজ। তবে মাত্র আট মাস বয়সে বিরল এক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার দুটি চোখই অপসারণ করতে হয়। জীবনের শুরুতেই নেমে আসে অন্ধকার। কিন্তু সেই অন্ধকার তার স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও শিক্ষার প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। অর্জন করেন পবিত্র কোরআনের হাফেজ হওয়ার গৌরব। এরপর সাধারণ শিক্ষার ধারাবাহিকতায় এগিয়ে গিয়ে এইচএসসিতেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখেন।
তবে এই সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। বিশেষ করে এইচএসসি পরীক্ষার আগে শ্রুতিলেখক পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়তে হয় তাকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত শ্রুতিলেখক নীতিমালার জটিলতা এবং একই সময়ে অন্যান্য শ্রেণির পরীক্ষা চলমান থাকায় উপযুক্ত শ্রুতিলেখক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা করতে শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করতে গিয়ে মানসিক চাপের মুখে পড়েন ইমতিয়াজ ও তার পরিবার।
এমন সংকটময় মুহূর্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় বান্দরবানের আল-ফারুক ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগ ও সহযোগিতায় শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান ইমতিয়াজ। তার এই পথচলায় প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ সহায়।
শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় নয়, প্রযুক্তির জগতেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ইমতিয়াজ। চোখে দেখতে না পারলেও আধুনিক সহায়ক প্রযুক্তি ও স্ক্রিন রিডার সফটওয়্যার ব্যবহার করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ও ব্যাক-এন্ড ডেভেলপার হিসেবে। প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সহযোগিতা এবং প্রকৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যেও তৈরি করেছেন বেশ কয়েকটি কার্যকর মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। তার এই প্রযুক্তিচর্চা প্রমাণ করে, সুযোগ ও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও প্রযুক্তির জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন।
ইমতিয়াজের এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি তার মায়ের নিরলস পরিশ্রম, ত্যাগ ও অনুপ্রেরণা। প্রতিকূলতার প্রতিটি ধাপে ছেলের পাশে থেকে তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছেন তিনি। পরিবারের সহযোগিতা, নিজের অধ্যবসায় এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার মিলিয়েই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছেন ইমতিয়াজ।
ইমতিয়াজের বিশ্বাস, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের মেধা, যোগ্যতা কিংবা স্বপ্নের পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না। সহানুভূতির পরিবর্তে প্রয়োজন সমান সুযোগ, সহযোগিতা ও সহায়ক পরিবেশ। তাহলেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরাও নিজেদের যোগ্যতা দিয়ে পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
উচ্চশিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি প্রযুক্তির জগতে আরও দক্ষ হয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান ইমতিয়াজ। দৃষ্টির আলো না থাকলেও জ্ঞান, মেধা ও স্বপ্নের আলোয় নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তার এই পথচলা শুধু বান্দরবানের তরুণদের জন্য নয়, প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা প্রত্যেক মানুষের জন্যই এক অনুপ্রেরণার গল্প।


