কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষার্থীর পরিচয় গোপন রাখার পদ্ধতি চালুর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরের পরিবর্তে কোডিং বা ব্লাইন্ড ইভালিউশন পদ্ধতি চালু করা হলে মূল্যায়নে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ কমবে এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখনো প্রচলিত পদ্ধতিতেই উত্তরপত্রে রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর দৃশ্যমান রেখে খাতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সময় পরীক্ষার্থীর পরিচয় গোপন রাখা হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পূর্বপরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা কোনো ধরনের বিরোধ মূল্যায়নে প্রভাব ফেলার সুযোগ কমে যাবে। এ কারণে তারা সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার পাশাপাশি ইনকোর্স পরীক্ষাতেও কোডিং বা ব্লাইন্ড ইভালিউশন পদ্ধতি চালুর দাবি জানাচ্ছেন।
দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থীর নাম ও রোল সরাসরি না দেখিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিচয় গোপন থাকলে কমবে সংশয়
ব্লাইন্ড ইভালিউশন বা কোডিং পদ্ধতিতে পরীক্ষার খাতার পরিচয়সংক্রান্ত অংশ মূল্যায়নের আগে আলাদা করে রাখা হয় কিংবা খাতায় একটি নির্দিষ্ট কোড ব্যবহার করা হয়। ফলে মূল্যায়নকারী শিক্ষক পরীক্ষার্থীর নাম, রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর জানতে পারেন না। এতে মূলত উত্তরপত্রের মানের ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, শ্রেণিকক্ষের আচরণ কিংবা পূর্বের বিরোধের মতো বিষয় মূল্যায়নে সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলতে পারে। কারও কারও আশঙ্কা, ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণেও প্রাপ্য নম্বর কমে যেতে পারে। ফলে একজন শিক্ষার্থী প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পেলে সেটি উত্তরপত্রের মানের কারণে হয়েছে, নাকি অন্য কোনো কারণে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রুবায়েত হোসেন বলেন, কুবিতে পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে এখনো সনাতনী পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। পরীক্ষার খাতায় সরাসরি রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখতে হয় এবং মূল্যায়নের সময়ও তা শিক্ষকের কাছে দৃশ্যমান থাকে।
তিনি আরও বলেন, এই পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখে শিক্ষক যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন কি না, কিংবা পরিচিত শিক্ষার্থীকে তুলনামূলক বেশি নম্বর দেওয়া হয়েছে কি না, এ ধরনের প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের মনে তৈরি হয়। আবার রোল দেখে কোনো কোনো শিক্ষকের পক্ষপাতমূলক আচরণের আশঙ্কাও থাকে।
পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতক ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা তাসনিম নেহা বলেন, সেমিস্টার ফাইনালের উত্তরপত্রে কোডিং পদ্ধতি চালু করা হলে পরীক্ষার গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা আরও নিশ্চিত হবে। প্রচলিত রোল বা আইডির পরিবর্তে ওএমআর শিট ও বারকোড ব্যবহার করা হলে শিক্ষক পরীক্ষার্থীর পরিচয় জানতে পারবেন না।
আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাফরিনা আলমের মতে, শুধু সেমিস্টার ফাইনাল নয়, সম্ভব হলে ইনকোর্স পরীক্ষাতেও কোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। এতে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ যেমন কমবে, তেমনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয় পক্ষই অযাচিত অভিযোগ থেকে সুরক্ষা পাবেন।
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের স্নাতক ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাহিম বলেন, শিক্ষকরা মানুষ হওয়ায় অবচেতনভাবেও পূর্বধারণা বা পক্ষপাতিত্ব কাজ করতে পারে। কোনো শিক্ষার্থীর ক্লাস পারফরম্যান্স, উপস্থিতি কিংবা শিক্ষকের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়গুলো পরিচয় দেখার পর মূল্যায়নে সূক্ষ্ম প্রভাব ফেলতে পারে।
তার মতে, ব্লাইন্ড সিস্টেম চালু হলে কেবল উত্তরের মানের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং শিক্ষার্থীদের ফলাফলের প্রতি আস্থাও বাড়বে। এতে ‘স্যার আমাকে পছন্দ করেন না, তাই কম নম্বর দিয়েছেন’ এ ধরনের সংশয়ও কমে আসবে।
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বিষয়টিকে পুরোপুরি নাকচ করছেন না। বরং কোডিং পদ্ধতি চালুর সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ নুরুল করিম চৌধুরী বলেন, পূর্বের উপাচার্যের সময় একবার এ পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তখন তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এখন শিক্ষার্থীরা আবেদন করলে সেই আবেদনের ভিত্তিতে বিষয়টি উপাচার্যকে জানানো সহজ হবে। পাশাপাশি তিনি নিজেও বিষয়টি উপাচার্যকে জানাবেন বলে জানান।
বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সজল চন্দ্র মজুমদার বলেন, কুবিতে এ ব্যবস্থা চালু হলে তা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ হবে। এতে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে।
তিনি বলেন, শিক্ষকরা সবসময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করেন। তারপরও কোনো প্রশ্ন বা অভিযোগ তৈরি হলে ভবিষ্যতে যেন এমন অভিযোগ না ওঠে, সে ক্ষেত্রে কোডিং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে বিষয়টিকে শুধু মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন হিসেবেও দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান।
তিনি বলেন, কোডিং করা হলে এতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে কোডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হওয়ার অর্থ শিক্ষকদের প্রতি আস্থার প্রশ্নও সামনে আসছে। শিক্ষার্থীরা কেন কোডিং চাইছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন সরকার জানান, পরীক্ষার খাতায় রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর রাখার বিষয়টি নিয়ে তিনি আগে থেকেই ভেবেছেন। শিক্ষকদের নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রাখার পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কোডিং-ডিকোডিংকে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে দেখছেন তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষক নৈতিকভাবে ঠিক না থাকলে শুধু কোডিং-ডিকোডিং করেই পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। কোনো শিক্ষক চাইলে প্রিয় শিক্ষার্থীকে খাতার শেষ পাতায় নাম লিখে রাখতে বলতে পারেন কিংবা কোনো চিহ্ন, লোগো, মার্জিন, বক্স বা লেখার ধরন দিয়েও খাতা শনাক্ত করা সম্ভব। তাই কোডিংয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এসব বিষয় থেকে বিরত রাখাও জরুরি।
উপ-উপাচার্য আরও বলেন, পরীক্ষার খাতায় নাম, চিহ্ন, মার্জিন বা বক্স জাতীয় কোনো কিছু না রাখার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। এতে অনৈতিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করার সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।
উপ-উপাচার্য বলেন, অনেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ করতে চান না, কিন্তু পক্ষপাতের কারণে ফলাফল খারাপ হয়েছে এমন অভিযোগ তাদের মধ্যে থাকে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তিনি এটি নোট করে রেখেছেন। বিভাগ থেকে বিষয়টি শুরু করতে হবে এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে আলোচনা করে কোডিং-ডিকোডিং পদ্ধতি চালুর চেষ্টা করব।


