...|...|...

সারাদেশ

নড়াইলে পাটের দরপতনে বিপাকে চাষি

নড়াইল প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ২:৪৪ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৬, সকাল ৮:৪৮
Shares
নড়াইলে পাটের দরপতনে বিপাকে চাষি

নড়াইলে পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ছবি: টাইমস টুডে

নড়াইলে মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পেলেও নড়াইলে এখন পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে জেলার বাজারে পাটের দাম মণপ্রতি প্রায় আটশত থেকে এক হাজার টাকা কমেছে। মৌসুমের শুরুতে ৪ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হওয়া পাট বর্তমানে মানভেদে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ উঠে আসা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে চাষিদের মধ্যে।

কৃষকেরা জানান, পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, আগাছা দমন, কর্তন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও পরিবহনসহ প্রতিটি পর্যায়েই ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে বর্তমান দামে পাট বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

নড়াইলের জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নড়াইলে ২৩ হাজার ৫১৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার ১৯৮ টন। এরই মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ জমির পাট কর্তন শেষ হয়েছে। ফলে একসাথে বিপুল পরিমাণ পাট বাজারে উঠতে শুরু করায় সরবরাহ বেড়েছে।

নড়াইল জেলার অন্যতম বড় পাটের মোকাম সদরে তুলারামপুর, মাইজপাড়া , রূপগঞ্জ বাজার। কালিয়া উপজেলার কালিয়া বাজার বড়দিয়া বাজার ও নড়াগাতি বাজার। লোহাগড়া উপজেলার লাহুড়িয়া বাজার, মানিকগঞ্জ বাজার, লোহাগড়া বাজার, মিঠাপুর বাজার,দিঘলিয়া বাজার ঘুরে হাটে দেখা গেছে, সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকেরা পাট নিয়ে আসছেন। হাটে পাটের সরবরাহ বাড়ায় ফড়িয়া ও পাইকারদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। পাটের রং, আঁশের মান, আর্দ্রতা ও শুকানোর অবস্থা দেখে দর নির্ধারণ করছেন ব্যবসায়ীরা। দরদাম চূড়ান্ত হলে পাট কিনে তা গুদামে নেওয়া হচ্ছে।

দিঘলিয়া এলাকার পাটচাষি হাসান মোল্যা বলেন, মৌসুমের শুরুতে পাটের ভালো দাম পেয়েছি। এখন দাম অনেক কমে গেছে। অথচ চাষের সময় যে খরচ হয়েছে, তার কোনো কিছুই কমেনি। এভাবে দাম কমতে থাকলে পাট বিক্রি করে খরচের টাকাই উঠবে না।

আরেক কৃষক বলেন, অনেকের পাট ঘরে রেখে দেওয়ার সুযোগ নেই। সার-সেচের টাকা, শ্রমিকের পাওনা ও ধারদেনা পরিশোধ করতে পাট বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই বাজারদর কম হলেও বাধ্য হয়ে পাট ছাড়তে হচ্ছে।

পাটের দাম কমার জন্য ব্যবসায়ীরা মূলত বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। তুলারামপুর ও মিঠাপুর হাটের কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, মৌসুমের শুরুতে পাটের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেশি ছিল। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় একসাথে পাট কাটা ও বাজারজাত করায় সরবরাহ বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় দাম কমেছে।

তবে কৃষকদের একাংশের অভিযোগ, সরবরাহ বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ কম দামে পাট কেনার চেষ্টা করছেন। তাদের দাবি, বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

এদিকে পাটের দাম কমার পাশাপাশি ওজন নিয়েও অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। তাদের দাবি, প্রচলিত হিসাবে এক মণ ৪০ কেজি হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪২ কেজিতে এক মণ পাট হিসাব করা হচ্ছে। এতে প্রতি মণে কৃষককে অতিরিক্ত প্রায় দুই কেজি পাট দিতে হচ্ছে। ফলে কম বাজারদরের সাথে ওজনের বাড়তি চাপও কৃষকদের লোকসান বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

তবে, ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪২ কেজিতে পাট মাপার অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। কৃষকেরা অভিযোগটি তদন্ত করে সঠিক মাপজোক নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

কৃষকদের আশঙ্কা, বাজারে পাটের সরবরাহ আরও বাড়লে দাম আরও কমতে পারে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য কমে গিয়ে অনেক কৃষক লোকসানে পড়তে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহও কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে নড়াইলে পাটের আবাদ ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। অধিকাংশ জমির পাট কাটা শেষ হওয়ায় বর্তমানে বাজারে সরবরাহ বাড়ছে। এ অবস্থায় কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকদের দাবি, বাজার তদারকির পাশাপাশি সঠিক ওজন নিশ্চিত করে পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আব্দুল সালাম বলেন, পাটের বাজার পরিস্থিতি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। কোনো সিন্ডিকেট বা কারসাজির কারণে যাতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর। পাটের মাপজোক নিয়ে কৃষকদের অভিযোগও যাচাই করে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম বা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।