ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সরাসরি জোটে যোগ না দিয়ে বিরোধী শিবিরকে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন দেশটির শীর্ষ আরব রাজনৈতিক জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর প্রধান ইউসুফ জাবারিন। তবে গাজায় চলমান সামরিক অভিযান এবং পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনের নীতি বহাল থাকায় কোনো ইসরায়েলি কোয়ালিশন সরকারের প্রত্যক্ষ অংশ হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মিডল ইস্ট মনিটর-এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইউসুফ জাবারিন বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের আগ্রাসী সিদ্ধান্ত বিবেচনা করে কোনো ইসরায়েলি সরকারের সরাসরি অংশ হওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। তবে নেতানিয়াহু সরকারের পতন নিশ্চিত করতে জোটের বাইরে থেকে একটি বিকল্প সরকারকে সমর্থন দিতে আমরা প্রস্তুত।
মূলত নেতানিয়াহু ও তার কট্টর ডানপন্থি শরিকদের (যেমন বেন-গভির ও ইতামার স্মোট্রিচ) ক্ষমতা থেকে সরাতে প্রধান বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘চেঞ্জ ব্লক’ বা পরিবর্তনকামী জোটের সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থনের পথ খোলা রাখার কথা ইঙ্গিত করেন তিনি।
আরব আসন এখন ক্ষমতার চাবিকাঠি
৯০ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে ১২০ আসনের নেসেটে কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেখা পায়নি। তবে প্রধান দুটি আরব দল ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রা’আম’ যৌথভাবে ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে, যা পরবর্তী সরকার গঠনে অত্যন্ত নির্ণায়ক বা ‘কিংমেকার’ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
উল্লেখ্য, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব নাগরিক। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নেতানিয়াহু প্রশাসনের উগ্র জাতীয়তাবাদী পদক্ষেপ এবং গাজায় অবিরাম সামরিক অভিযানের ফলে আরব জনগোষ্ঠীর মনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং বিরোধী শিবিরের প্রধান সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট—উভয়েই ক্ষমতা দখলের কড়া বার্তা দিয়ে রেখেছেন। তবে জাবারিন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, নেতানিয়াহুর শাসনকে সরাতে হলে বিরোধী শিবিরকে অবশ্যই আরবদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে সংলাপে বসতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—হয় বর্ণবাদ ও বর্জনের ধারা অব্যাহত থাকবে, না হয় ইহুদি ও আরবদের মধ্যে এক বাস্তব অংশীদারত্ব গড়ে উঠবে।
লিকুদের জালিয়াতির অভিযোগ ও গ্রেফতারি
অন্যদিকে, ফলাফল আসার আগেই নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি আরবি দলগুলোর বিরুদ্ধে ভোট ‘চুরি’ করার অভিযোগ এনেছে। লিকুদের দাবি, সন্ত্রাসবাদ ও ইহুদি রাষ্ট্র ধ্বংসকে সমর্থনকারী আরব দলগুলো ঘুষ, হুমকি, জালিয়াতি ও নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহার করে জনরায় ছিনতাইয়ের চক্রান্ত করছে। নগদ টাকাসহ অন্যান্য প্রমাণের নথি পুলিশের কাছে জমার দাবিও করে দলটি।
ভোটের দিন রাতেই পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে নগদ ২৪ হাজার শেকেল (প্রায় ৭,৯০০ ডলার) ও ‘রা’আম’ দলের ব্যালট পেপার উদ্ধার করে।
তবে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক দিন লিভনে ঘটনাটিকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ আখ্যা দিয়ে জানান, সন্দেহভাজনদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই বাড়ির কাছ থেকে আটক করা হয় এবং বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অন্যদিকে ‘রা’আম’ দলের প্রধান মনসুর আব্বাস এবং বিরোধী নেতা আইজেনকোটের শিবির নেতানিয়াহুর এই দাবিকে পরাজয় ঢাকতে আগে থেকেই বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিরোধী জোটে দ্বিধাবিভক্তি
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু হয় ডানপন্থি, নয় ফিলিস্তিন স্লোগান তুলে বিরোধীরা জিতলে আরবদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
যদিও বিরোধী প্রধান গাদি আইজেনকোট নিজে আরবদের পাশে নিতে কিছুটা অনিচ্ছুক, তবে তার জোটের শরিক দল ইসরায়েলের প্রধান বামপন্থীদের প্রধান ইয়াইর গোলান ভিন্ন পথ গ্রহণ করেছেন। প্রথম বিরোধী নেতা হিসেবে তিনি প্রকাশ্যে আরব দলকে সাথে নিয়ে সরকার গড়ার তাগিদ দিয়েছেন। গোলান বলেন, নেতানিয়াহু হেরে গেছেন। ইহুদি ও আরব ভোটের মধ্যে তৈরি করা কৃত্রিম বর্ণবাদী বিভাজন আর মেনে নেওয়া যায় না।
তবে আইজেনকোটের জোটে থাকা কট্টর ডানপন্থি অন্যান্য আইনপ্রণেতারা এখনও আরব প্রতিনিধিদের সাথে কোনো ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন।


