ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনের ভোট গণনা শেষ হলেও কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র সরকার গঠনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনি মূলধারার আরব দলগুলোর সাথে কোনো ধরনের কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছেন।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো দলই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্তত ৬১টি আসন এককভাবে বা সহজে নিশ্চিত করতে পারেনি। এ অবস্থায় বিরোধী দলগুলো সম্ভাব্য বিকল্প জোট গড়ার উপায় ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চালাচ্ছে।
ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম হ্যারেৎস-এর বরাতে জানানো হয়, ৯৯ শতাংশেরও বেশি ভোট গণনা শেষে ১২০ আসনের নেসেটে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। তবে এই নির্বাচনে রেকর্ড সাফল্য দেখিয়ে আরব দলগুলোর জোট যৌথভাবে ১৯টি আসন দখল করেছে।
নিয়ম অনুযায়ী আগামী বুধবারের মধ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন অফিসিয়াল ফলাফল চূড়ান্ত ও অনুমোদন করবে। তত দিন পর্যন্ত ফলাফলে সাময়িক পরিবর্তন আসতে পারে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজায় সামরিক অভিযান শুরুর পর এই প্রথম ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, যা মূলত নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রীত্বের ওপর একপ্রকার গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
বিরোধী শিবিরে জোট গঠনের তোড়জোড়
বৃহস্পতিবার ‘ইয়াশার’ দলের প্রধান গাদি আইজেনকোট সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ‘টুগেদার’ পার্টির প্রধান নাফতালি বেনেটের সাথে দেখা করে দ্রুততম সময়ে সরকার গঠনের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
পরবর্তীতে আইজেনকোট ‘ডেমোক্র্যাটস’ পার্টির চেয়ারম্যান ইয়াইর গোলানের সাথে বৈঠক করেন। পুরো বিরোধী জোটে একমাত্র ইয়াইর গোলানই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের আরব দলগুলোকে সাথে নিয়ে সরকার গঠনের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নিয়েছেন। অন্য সব রাজনৈতিক দল এই ধরনের কোনো সমঝোতার কথা শুরুতেই উড়িয়ে দিয়েছে। গোলান পৃথকভাবে মনসুর আব্বাসের সাথেও বৈঠক করেন, যার দল ‘রা’আম’ (সংযুক্ত আরব তালিকা) আরবদের পাওয়া ১৯টি আসনের মধ্যে ৮টিতে জয় পেয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আইজেনকোটের জন্য পথটি অত্যন্ত কঠিন। সাবেক এই সামরিক প্রধান আগেই অঙ্গীকার করেছিলেন যে তিনি কোনো অবস্থাতেই আরব দলগুলোর সাথে সরাসরি জোট বাঁধেন বা অংশীদার হবেন না। কিন্তু গাণিতিক হিসাবে কোনো পক্ষেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় আরবদের সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের পক্ষে সরকার গড়া একপ্রকার অসম্ভব।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ
এদিকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি ক্রমাগত দাবি করে আসছে যে, বিদেশি সহায়তায় আরব দলগুলো এই নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোয়াম সোহলবার্গ জানান, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে তাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’কে অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ করেছেন।
বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট নেতানিয়াহুর এই অভিযোগের কড়া জবাব দিয়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু মূলত পরাজয়ের ভয়ে ফলকে বিতর্কিত করতে চাইছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ পোস্ট করা এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ইসরায়েলের স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে নেতানিয়াহুর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করার দিন শেষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাভিয়ের আবু ঈদ বলেন, নেতানিয়াহু হয়তো বারবার বিজয়ের দাবি করছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ফলাফলে মোটেই সন্তুষ্ট নন। তিনি আরও বলেন, যদিও মতপার্থক্য গুটিয়ে বিরোধীদের পক্ষে আরব দলগুলোর সাথে সরকার গড়া কঠিন, তবে নেসেটের স্পিকার পদে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ কাউকে সরিয়ে নতুন স্পিকার বসানোর মতো একটা সমঝোতা বিরোধীরা করতেই পারে। তেমনটি হলে নেতানিয়াহু তার অন্যতম বড় রাজনৈতিক মিত্রকে হারাবেন এবং বিরোধীরা সংসদে তার বিরুদ্ধে বিল পাসের পথ তৈরি করতে পারবে।


