বলিউড আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগসূত্র নিয়ে বহু কথা প্রচলিত থাকলেও এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলা শিল্পীর সংখ্যা হাতেগোনা। এবার সেই তালিকায় যোগ দিলেন প্লেব্যাক কন্ঠশিল্পী কুমার শানু।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি ফিরে গেছেন নব্বইয়ের দশকের দুটি স্মৃতিতে, যেখানে না জেনেই জড়িয়ে পড়েছিলেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই কুখ্যাত নামের সাথে।
গল্পের শুরু সংগীত পরিচালক নাদিম সাইফির একটি প্রস্তাব দিয়ে। দুবাইয়ে একটি ব্যক্তিগত জন্মদিনের আসরে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পান কুমার শানু। আয়োজক কে, কার জন্মদিন- কিছুই জানানো হয়নি তাকে।
সরল বিশ্বাসে দুবাই উড়ে যান, মঞ্চে ওঠেন, শ্রোতাদের চাহিদামতো একের পর এক গান শোনান।সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়। সমস্যা বাধে দেশে ফেরার পর।
কয়েক দিন পরই সংবাদপত্রের পাতায় নিজের ছবি দেখে চমকে ওঠেন গায়ক- যার অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন, তিনি স্বয়ং দাউদ ইব্রাহিম, ভারতের সবচেয়ে আলোচিত পলাতক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন।
শানুর ভাষ্যমতে- এই পরিচয় আগে জানা থাকলে তিনি কখনোই সেখানে পা রাখতেন না। তার কথায়, একজন শিল্পীর কাছে আমন্ত্রণ মানেই কেবল একটি মঞ্চ, একটি শ্রোতা আর কিছু গান- এর বাইরে কার টাকায় বা কার আয়োজনে অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেই হিসাব রাখার সুযোগ বা কারণ কোনোটাই সাধারণত থাকে না।
আরেকটি ঘটনায় প্রথমে চাঁদা দাবি করে ফোন আসে তার কাছে, যা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন গায়ক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, টাকা দেওয়ার প্রশ্নই নেই, তবে বৈধ কোনো অনুষ্ঠানের প্রস্তাব হলে বিবেচনা করবেন।
কিছুদিন পর সেই যোগাযোগের সূত্র ধরেই প্রস্তাব আসে দুবাইয়ে একটি অনুষ্ঠানের, যার নেপথ্যে যে ব্যক্তি ছিলেন-আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক আলোচিত ও তখনো পলাতক নাম আবু সালেম, সেটি পরে জানতে পারেন শানু।
এবার অবশ্য আগে থেকেই সতর্ক করে ভারতীয় পুলিশ। তারা সরাসরি অনুরোধ জানায়, যেন তিনি ওই অনুষ্ঠানে অংশ না নেন- এমনকি সেখানে গেলে ফেরার পর তাকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
জবাবে শানু পাল্টা প্রশ্ন তোলেন পুলিশের কাছে- তিনি যদি অনুষ্ঠান বাতিল করেন এবং তার জেরে তার ওপর কোনো হামলা হয়, তাহলে সেই নিরাপত্তার দায়ভার কে নেবে? কোনো সদুত্তর না পেয়ে শেষমেশ নিজের সিদ্ধান্তেই অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি, গান গেয়ে নির্বিঘ্নেই দেশে ফিরে আসেন।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ কখনো ছিল না বলে জোর দিয়ে দাবি করেন শানু। তার মতে, সে সময় বহু শিল্পীই জানতেন না অনুষ্ঠানের নেপথ্যের অর্থদাতা বা প্রকৃত আয়োজক কারা- তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল কেবল পারফর্ম করার মধ্যে, বাকিটা ম্যানেজার বা আয়োজকদের হাতে থাকত।
নব্বইয়ের বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অর্থ ঢোকা এবং সিনেমার প্রযোজনা থেকে শুরু করে কাস্টিং পর্যন্ত নানা সিদ্ধান্তে সেই প্রভাব পড়াটাকে তিনি সে সময়কার এক তেতো বাস্তবতা বলেই বর্ণনা করেন। তবে ব্যক্তিগতভাবে সবসময় সচেতন দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন বলেই বড় কোনো বিপদে পড়তে হয়নি, এমনটাই তার দাবি।
বলিউড-আন্ডারওয়ার্ল্ড সংযোগ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তদন্ত, আদালতের মামলা আর সাংবাদিকতার অনুসন্ধান হয়েছে। বিদেশে আয়োজিত স্টেজ শো, সিনেমায় বেনামি অর্থ বিনিয়োগ এবং শিল্পীদের ভয়ভীতি দেখানোর মতো অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে এসব অনুসন্ধানে।
১৯৯০-এর দশকজুড়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যাংক ঋণ বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের সুযোগ সীমিত থাকায় অনেক প্রযোজকই বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতেন, আর সেই ফাঁক দিয়েই ঢুকে পড়ত আন্ডারওয়ার্ল্ডের টাকা। পরবর্তী সময়ে করপোরেট বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণের দরজা খুলে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে সেই অন্ধকার প্রভাব।
কুমার শানুর মতো সে সময়ের প্রথম সারির শিল্পীদের এমন অভিজ্ঞতা আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, বলিউডের গ্ল্যামারের আড়ালে কতটা জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল সেই বাস্তবতা।




