...|...|...

বরিশাল

এক ট্রলিং বোটে ৮০ মণ ইলিশ, সাধারণ জেলেদের জালে শূন্যতা

পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ১২:২১ | আপডেট: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৮:৩৬
Shares
এক ট্রলিং বোটে ৮০ মণ ইলিশ, সাধারণ জেলেদের জালে শূন্যতা

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপকূলের অদূরে বঙ্গোপসাগরে মাত্র দুই দিনের মাছ ধরায় একটি আর্টিসানাল ট্রলিং বোটে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ ধরা পড়েছে। বিপুল পরিমাণ ইলিশ নিয়ে ট্রলারটি আলিপুর মৎস্য বন্দরে পৌঁছানোর পর ঘটনাটি স্থানীয় জেলেদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ, একই সময়ে সাগরে গিয়ে অনেক সাধারণ জেলে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন।

বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ নিয়ে এফবি আব্দুল্লাহ নামের ট্রলারটি আলিপুর মৎস্য বন্দরে আসে। পরে বন্দরের সিফাত ফিসে নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো প্রায় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।

ট্রলারটির মাঝি বাদশার ভাষ্য অনুযায়ী, চার দিন আগে ১৮ জন জেলেকে নিয়ে তারা সমুদ্রে রওনা হন। প্রথম দুই দিন মাছ ধরার পর মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পায়রা বন্দরের শেষ বয়া সংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় জালে একসাথে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। পরিমাণের দিক থেকে মাছ অনেক হলেও আকারে অধিকাংশ ইলিশ তুলনামূলক ছোট ছিল বলে জানান তিনি।

এদিকে কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী এলাকার জেলেরা বলছেন, বর্তমানে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আগের মতো সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েক দিন সমুদ্রে অবস্থান করার পরও অনেক নৌযানকে অল্প মাছ নিয়ে তীরে ফিরতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের পেছনে হওয়া ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানান তারা।

স্থানীয় জেলে হানিফ মাঝি বলেন, কয়েক বছর আগেও অল্প সময় সমুদ্রে থাকলেই ভালো পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত। এখন দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থান করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যায় না। তার অভিযোগ, কিছু ট্রলিং বোট অগভীর সমুদ্রের বিভিন্ন এলাকায় একসাথে বড় পরিমাণ মাছ তুলে নেওয়ায় সাধারণ জেলেদের মাছ আহরণের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

জেলেদের ভাষ্য, কিছু ট্রলিং বোটে মাছের অবস্থান শনাক্ত করতে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। মাছের ঝাঁকের অবস্থান শনাক্ত করার পর বিশেষ ধরনের জাল ফেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

এ ধরনের আহরণ পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন জেলেরা। তাদের দাবি, অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহারের ফলে বড় ইলিশের পাশাপাশি ছোট ইলিশ, পোনা এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীও জালে আটকা পড়তে পারে। ছোট মাছ ও পোনা ব্যাপক হারে আহরণ করা হলে পরবর্তী সময়ে সাগরে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও মজুতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতেও কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে আরেকটি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং ট্রলারের জালে একবারে প্রায় ৪৬ মণ ইলিশ ধরা পড়েছিল। পরে ওই মাছ প্রায় ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কাছাকাছি সময়ে একই উপকূলীয় এলাকায় ট্রলিং বোটে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরণের একাধিক ঘটনা সামনে আসায় বিষয়টি নিয়ে সাধারণ জেলেদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জেলেদের প্রশ্ন, সাগরে যদি ইলিশের উপস্থিতি এত বেশি হয়ে থাকে, তাহলে সাধারণ জেলেদের জালে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না কেন? নাকি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকায় মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী জাল দিয়ে দ্রুত বিপুল পরিমাণ মাছ তুলে নেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

জেলেদের মতে, সমুদ্র থেকে বেশি মাছ পাওয়া গেছে—শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। কোন ধরনের নৌযান মাছ ধরছে, কোথায় মাছ ধরা হচ্ছে, কী ধরনের জাল ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ধরা পড়া মাছের আকার কেমন—এসব বিষয়ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

মৎস্যসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট আকারের ইলিশকে বড় হওয়ার সুযোগ না দিয়ে অতিরিক্ত আহরণ করা হলে ভবিষ্যতে প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে বিভিন্ন প্রজাতির পোনা ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী ধরা পড়লে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পাশাপাশি অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে। অবৈধ জাল তৈরি বন্ধের পাশাপাশি অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, সামুদ্রিক মৎস্য আইনের তফসিল অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ জাল ব্যবহার করে ট্রলিংয়ের অভিযোগে বোট মালিকদের মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে। এর আগেও এ ধরনের অভিযোগে কয়েকটি বোট জব্দ করে মামলা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তবে একদিকে অল্প সময়ে ট্রলিং বোটে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়া এবং অন্যদিকে সাধারণ জেলেদের মাছের সংকটের অভিযোগ—দুই বিষয়ই এখন উপকূলীয় মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। জেলেদের দাবি, সমুদ্রের সম্পদ যাতে সীমিতসংখ্যক বোটের মাধ্যমে অতিরিক্ত আহরণ না হয়, সেজন্য নিয়মিত অভিযান ও কার্যকর নজরদারি আরও জোরদার করা দরকার।

তাদের মতে, সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সাধারণ জেলেদের জীবিকা সুরক্ষিত রাখতে অবৈধ ট্রলিং ও ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।