প্রকৃতি যখন তার শান্ত রূপ ছেড়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে, তখন মানুষের গড়া সভ্যতা মুহূর্তেই তছনছ হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসেছে, যা মানবজাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক দুর্যোগের নাম ‘সুনামি’।
সমুদ্রের তলদেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট এই দানবীয় ঢেউ নিমেষেই গিলে খেয়েছে লাখ লাখ প্রাণ, লণ্ডভণ্ড করেছে উপকূলীয় জনপদ।
ইতিহাসের পাতা থেকে বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলা তেমনই কিছু ভয়াবহ সুনামির বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ভারত মহাসাগরের সুনামি : প্রায় ২,২৭,৮৯৯ জন নিহত
২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪ সালে ইন্দোনেশিয়া (সুমাত্রা), থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ভারতসহ ১৪টি দেশ।
কারণ: সুমাত্রা উপকূলে সৃষ্ট ৯.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প।
এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সুনামি। সমুদ্রের তলদেশ উল্টে গিয়ে প্রায় ৫০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশাল অঞ্চল জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
২. মেসিনা সুনামি, ইতালি : প্রায় ১,০০,০০০ জন নিহত
২৮ ডিসেম্বর, ১৯০৮, মেসিনা এবং কালাব্রিয়া, ইতালি
কারণ: ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প এবং এর ফলে সমুদ্রগর্ভে সৃষ্ট ভূমিধস।
ভূমিকম্পের মাত্র কয়েক মিনিট পরেই প্রায় ১২ মিটার উঁচু ঢেউ উপকূলীয় শহরগুলোকে সম্পূর্ণ ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ভূমিকম্প ও সুনামির যৌথ আঘাতে প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।
৩. লিসবন সুনামি, পর্তুগাল: প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ জন নিহত
১ নভেম্বর, ১৭৫৫
স্থান: পর্তুগাল, স্পেন এবং মরক্কো。
কারণ: আটলান্টিক মহাসাগরে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পের পর পর্তুগালের লিসবন উপকূলে প্রায় ৩০ মিটার (প্রায় ৫৯ ফুট) উঁচু তিনটি বিশালাকার ঢেউ আঘাত হানে। এটি শহরের বেশিরভাগ অংশ ধ্বংস করে দেয়।
৪. ক্রাকাতোয়া সুনামি, ইন্দোনেশিয়া: প্রায় ৩৬,০০০ জন নিহত
২৭ আগস্ট, ১৮৮৩।
সুন্দা প্রণালী, ইন্দোনেশিয়া।
কারণ: ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির প্রচণ্ড বিস্ফোরণ এবং ক্যালডেরা ধস।
আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জোরালো আগ্নেয় বিস্ফোরণের ফলে ১৩০ ফুট উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়, যা সম্পূর্ণ সুন্দা প্রণালীর উপকূলীয় শহর ও গ্রামগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
৫. এনশোনাডা সাগরের সুনামি, জাপান: প্রায় ৩১,০০০ জন নিহত
২০ সেপ্টেম্বর, ১৪৯৮।
এনশোনাডা সাগর, জাপান।
কারণ: আনুমানিক ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প।
এই সুনামির কারণে জাপানের কিই, ইজু এবং মিকাওয়া অঞ্চলের বিশাল অংশ প্লাবিত হয়। ঢেউয়ের তোড়ে বিখ্যাত মহামতি বুদ্ধের (Great Buddha) ভাস্কর্যটি ধারণকারী মন্দির ভবনটি ভেসে গিয়েছিল।
৬. নানকাইদো সুনামি, জাপান: প্রায় ৩০,০০০ জন নিহত
২৮ অক্টোবর, ১৭০৭
কিয়ুশু, শিকোকু এবং হোনশু, জাপান।
কারণ: ৮.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প।
২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হওয়া ডজনখানেক সুনামি ঢেউ এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জাপানের উপকূলীয় অঞ্চলে আঘাত হানে, যা মাইলের পর মাইল স্থলভাগকে লোনা পানিতে ডুবিয়ে দেয়。
৭. সানরিকু সুনামি, জাপান: প্রায় ২৭,০০০ জন নিহত
১৫ জুন, ১৮৯৬
সানরিকু উপকূল, জাপান。
কারণ: ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প。
সানরিকুর এই ভূমিকম্পে ঝাঁকুনি কম হলেও এটি সমুদ্রতলে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এর ফলে সৃষ্ট ১২৪ ফুট (৩৮.২ মিটার) উঁচু ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে ১১,০০০ বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
৮. আরিকা সুনামি, চিলি/পেরু: প্রায় ২৫,০০০ জন নিহত
১৩ আগস্ট, ১৮৬৮
আরিকা (তৎকালীন পেরু, বর্তমান চিলি)।
কারণ: প্রশান্ত মহাসাগরে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প。
এই সুনামির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে এর ঢেউ প্রায় ২১ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে ওঠে এবং প্রায় ২ থেকে ৩ দিন ধরে পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এর প্রভাব বজায় ছিল, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি পর্যন্ত এর ঢেউ পৌঁছায়।
৯. তোহোকু সুনামি, জাপান: প্রায় ১৮,৫০০ জন নিহত
১১ মার্চ, ২০১১
উত্তর-পূর্ব জাপান (তৌহোকু অঞ্চল)
কারণ: ৯.০ মাত্রার মেগা-ভূমিকম্প
এটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে নথিবদ্ধ এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর সুনামি। ১২৭ ফুট উঁচু ঢেউ জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হেনে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটায়।
১০. মাউন্ট উনজেন সুনামি, জাপান: প্রায় ১৫,০০০ জন নিহত
২১ মে, ১৭৯২
শিমাবারা উপসাগর, কিউশু দ্বীপ, জাপান。
কারণ: মাউন্ট উনজেন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও ভূমিধস।
আগ্নেয়গিরির তীব্র বিস্ফোরণের পর পুরো পাহাড়ের একপাশ ধসে শিমাবারা উপসাগরে পড়ে। এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক মেগা-সুনামি পুরো অববাহিকায় আঘাত হেনে প্রায় ১৫,০০০ মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।


