কুমিল্লায় একের পর এক শিশু-কিশোরের হত্যাকাণ্ড উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জনমনে। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই এবার লালমাইয়ের ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হয়েছে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের লাশ। দুই ঘটনায় পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একই প্রশ্ন সামনে এসেছে—কুমিল্লায় শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? আর কত প্রাণহানির পর কার্যকর হবে অপরাধ প্রতিরোধের ব্যবস্থা?
গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার সানন্দা পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের লাশ। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতীম। পরে তার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ জানায়, আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়।
অপ্রতীম হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া এলাকার একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) লাশ। সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। কাছেই পাওয়া যায় একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। আশপাশের কয়েকটি ধানক্ষেতে দেখা যায় দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন। এসব আলামত ঘিরে মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তবে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্তের ফলই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাবাকে লোকেশন পাঠিয়েও ফিরতে পারল না তাজমিন
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যায়। বুধবার রাতে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরে পদুয়া বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে।
রাতের কোনো একপর্যায়ে বাবার কাছে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে সেখানে গিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায় তাজমিন। কিন্তু মেয়ের পাঠানো বার্তাটি তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেননি বাবা আবদুল আলীম।
পরে মেয়েকে খুঁজতে বের হয়ে যে খবর পান, তা তাঁর পরিবারের জন্য নেমে আসে চরম শোক হয়ে। যে মেয়েকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার আশায় তিনি খুঁজছিলেন, শেষ পর্যন্ত তার লাশই উদ্ধার হয় ধানক্ষেত থেকে।
তাজমিনের এই পরিণতি শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অসংখ্য অভিভাবকের মনেও তৈরি করেছে আতঙ্ক।
নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
অপ্রতীম ও তাজমিনের মৃত্যুর ঘটনা আবারও সামনে এনেছে শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। সন্তান বাড়ি থেকে বের হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের ভূমিকা কতটা কার্যকর—এখন সেই প্রশ্নও আলোচনায় আসছে।
কুমিল্লা নাগরিক আন্দোলন বাংলাদেশের সভাপতি ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, অপ্রতীমের পর তাজমিনের মর্মান্তিক মৃত্যু কুমিল্লার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
তিনি বলেন, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু ঘটনার পর গ্রেফতার নয়, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কোনো পরিবারকে যেন আর সন্তানের এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান সাদিয়া তাবাসসুম তমা বলেন, শিশু-কিশোরদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং তদন্তের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, আলামত সংরক্ষণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রশ্ন একটাই—নিরাপদ শৈশব কোথায়?
দুটি হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার মানুষের প্রত্যাশা, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা কেবল কোনো একটি পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অপ্রতীম ও তাজমিনের মৃত্যু যেন কেবল শোক আর ক্ষোভের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। তাদের মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
আর তাই কুমিল্লার মানুষের প্রশ্ন—অপ্রতীমের পর তাজমিন, এরপর আর কার পালা? আর কত প্রাণ ঝরলে নিরাপদ হবে এই জনপদ?


