বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। যোগাযোগ, বিনোদন, পড়াশোনা কিংবা কাজ-প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার রয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সময় মোবাইল ফোনে কাটালে তা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মনোবিজ্ঞান ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে মনোযোগের ঘাটতি, স্মৃতিশক্তির সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত এবং মানসিক চাপের সম্পর্ক উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় এমন পাঁচটি সম্ভাব্য প্রভাব উল্লেখ করা হয়।
১. ডোপামিনের ওপর প্রভাব ও ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন পোস্ট, লাইক, মন্তব্য কিংবা মোবাইল গেমের বিভিন্ন পুরস্কার মস্তিষ্কের পুরস্কার-সংক্রান্ত ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। এর সাথে ডোপামিনের ভূমিকা রয়েছে। বারবার নতুন কিছু দেখার আগ্রহ থেকে অনেকেই ঘন ঘন ফোন হাতে নেন। একপর্যায়ে প্রয়োজন না থাকলেও ফোন ব্যবহারের অভ্যাস তৈরি হতে পারে এবং দৈনন্দিন কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২. স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে ঘাটতি
দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার এবং অল্প সময়ের মধ্যে বারবার এক কাজ থেকে অন্য কাজে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে পড়াশোনা বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় বারবার নোটিফিকেশন দেখা তথ্য মনে রাখা ও কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও নতুন তথ্য শেখা ও স্মৃতিতে ধরে রাখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
৩. ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হওয়া
ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি ভিডিও দেখা, গেম খেলা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোর কারণে ঘুমাতে যাওয়ার সময় পিছিয়ে যায়। এর ফলে ঘুমের সময় কমে যাওয়া এবং পরদিন ক্লান্তি অনুভব করার আশঙ্কা থাকে।
৪. উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাজানো জীবনযাপন, সাফল্য কিংবা আনন্দের মুহূর্ত দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের তুলনা কারও কারও মধ্যে হতাশা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও মানসিক চাপ বাড়ায়। এ ছাড়া অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর কারণে বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ কমে গেলে একাকিত্বও অনুভূত হতে পারে। এসব বিষয় মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. মানসিক ক্লান্তি ও কগনিটিভ ওভারলোড
সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা, একের পর এক নোটিফিকেশন পাওয়া এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে কগনিটিভ ওভারলোড বলা হয়। এর ফলে কোনো বিষয়ে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। পাশাপাশি বিরক্তি, সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা এবং মানসিক ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে।
যা করতে পারেন
মোবাইল ফোনের নেতিবাচক প্রভাব কমাতে প্রতিদিনের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট রাখা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা, ঘুমানোর অন্তত কিছুক্ষণ আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ রাখা এবং অবসর সময়ে বই পড়া, ব্যায়াম কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।


