...|...|...

বিশ্ব

‘যৌন হয়রানি, ধর্মান্তরের চাপ’, আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গের খ্রিস্টানরা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:৫৪
Shares
‘যৌন হয়রানি, ধর্মান্তরের চাপ’, আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গের খ্রিস্টানরা

ছবি: সংগৃহীত

ভারতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা, মানসিক নিপীড়ন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার চেষ্টার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাড়িঘরে ভাঙচুর, নারীদের ওপর যৌন হয়রানি এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার হুমকিতে বর্তমানে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন রাজ্যের একাধিক জেলার খ্রিস্টান পরিবারগুলো। 

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অন্তত ১৩টি জেলায় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৬০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

পাঁশকুড়ায় বাড়িতে ঢুকে হামলা ও হুমকি

পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার বাসিন্দা পার্বতী হেমব্রম সোরেন অভিযোগ করেন, গত সোমবার রাতে স্বজনদের নিয়ে প্রার্থনার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) সদস্য পরিচয়ে ৩০ জনেরও বেশি মদ্যপ ব্যক্তি তাদের বাড়িতে অনাধিকার প্রবেশ করে।

হামলার বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, দুষ্কৃতকারীরা তাকে ও তার ননদকে শারীরিক নিগ্রহ করে, মারধর করে এবং মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। উপরন্তু, তাদের প্রার্থনাস্থল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগী পরিবারটিকে খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্মে ফিরে আসতে এবং উঠোনে মনসামন্দির ও তুলসিমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। তাদের কথায় রাজি না হওয়ায় বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, রেশন ও ‘আয়ুষ্মান ভারত’ কার্ডের সুবিধা বন্ধ করার পাশাপাশি কাজ না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

আতঙ্কিত পরিবারটি বর্তমানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এই বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও পুলিশ এখনো কোনো মামলা বা এফআইআর দায়ের করেনি।

চন্দ্রকোনায় নারীকে বিবস্ত্র করে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর অভিযোগ

এর আগে গত ১৮ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় একাধিক খ্রিস্টান পরিবারের ওপর বজরং দলের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে নৃশংস হামলার অভিযোগ উঠে।

অভিযোগকারী এক নারী জানান, ১৮ অক্টোবর বজরং দলের সদস্যরা তার বাড়িতে ঢুকে যিশু খ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাস ত্যাগ করতে চাপ দেয়। বাধা দিলে তার মাথায় আঘাত করে সংজ্ঞাহীন করা হয় এবং শাড়ি ও পোশাক ছিঁড়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তার সম্মতি ছাড়া সবার সামনে তাকে স্নান করিয়ে জোরপূর্বক তথাকথিত ‘শুদ্ধিকরণ’ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এর দুই দিন পর ওই নারীসহ চারজন খ্রিস্টানকে জোর করে স্থানীয় পূজামণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়।

এই ঘটনায় পুলিশ হত্যাচেষ্টা, শ্লীলতাহানি ও নারী নিগ্রহের ধারায় এফআইআর দায়ের করলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশের দাবি, পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবেই আইনি পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হচ্ছে।

ভিএইচপির প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়

অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাজ্য নেতা চন্দ্রনাথ দাস জানান, তারা নিজের হাতে আইন তুলে নেন না, তবে পশ্চিমবঙ্গসহ পুরো ভারতে ‘ধার্মিক শিক্ষার’ মাধ্যমে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার অভিযান তাদের পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য। তিনি স্পষ্ট করেন, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধর্মান্তর রোধ ও নিজ ধর্মে ফিরিয়ে আনা তাদের মূল এজেন্ডা।

এদিকে একের পর এক ঘটনায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ‘বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা’ নামক সংগঠন।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার জানান, তাদের সরকার যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং ধর্মান্তরকরণ রাষ্ট্রে স্বীকৃত নয়। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা কে সি বেণুগোপাল মেদিনীপুরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের শাস্তির দাবিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি পাঠিয়েছেন।