...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

ওয়াসার ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট

৫ হাজার কোটির প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়

দফায় দফায় মেয়াদ বাড়লেও শেষ হয়নি ১৩ বছরে

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:২৬
Shares
৫ হাজার কোটির প্রকল্পে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়

ছবি: এআই জেনারেটেড

রাজধানীর কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে বিগত দেড় দশকে একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। দেখিয়েছে আধুনিক ও টেকসই পানি সরবরাহব্যবস্থার স্বপ্ন। তবে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন। নগরের বড় একটি অংশের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে ৫ হাজার ১৪২ কোটি টাকার ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট’ হাতে নেয় প্রতিষ্ঠানটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় ১৩ বছরেও শেষ হয়নি নিরাপদ পানি সরবরাহের এই প্রকল্পের কাজ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলেও দফায় দফায় বেড়েছে মেয়াদ ও ব্যয়। প্রকল্পের মেয়াদ গড়িয়েছে আগামী বছর পর্যন্ত। আর ৫ হাজার ১৪২ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায়। টাইমস টুডের অনুসন্ধান ও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের চিত্র। 

তথ্য বলছে, ২০১৩ সালে প্রকল্পটি অনুমোদন পায় । শুরুর  সাড়ে সাত বছরে বড় অগ্রগতি ছাড়াই পার করে। প্রথম সংশোধনী ২০২১ সালে এক ধাক্কায় মূল ব্যয়ের ৫৫ শতাংশ বা ২ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে বাজেট করা হয় ৮ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনে ২০২২ সালে ব্যয় সামান্য কমিয়ে ৮ হাজার ১৪৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা করা হয়। এতে কাজের গতি তিলপরিমাণও বাড়েনি। তৃতীয় সংশোধনী ২০২৫ সালে ব্যয় বৃদ্ধিতে বাজেট লাফ দিয়ে ১০ হাজার ৯৭৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকায়। 

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিংহভাগ অর্থ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে পাওয়া ঋণে। শুরুতে এডিবির ঋণ ছিল ৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা, এখন ৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। ঋণ বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। বিপুল ঋণের আসল ও সুদের কড়ায়-গণ্ডায় মাশুল গুনতে হবে  নগরবাসীকে। প্রশ্ন উঠেছে সরকার ও ওয়াসার নিজস্ব অর্থায়নের অংশ নিয়ে। শুরুতে নিজস্ব তহবিল ছিল ১ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা, যা এখন ৪ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা। নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় বাড়ার হার আকাশচুম্বী, প্রায় ১৪২ শতাংশ।

নথি ঘেটে আরও দেখা যায়, এ বছর আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পে মোট অনুদান ও ঋণ মিলিয়ে ছাড় হয়েছে ৭ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। খরচ দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। যা সংশোধিত মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ। অথচ বাস্তবে কাজের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকার কাজ অসম্পূর্ণ । এদিকে, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এ প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের পুরো অর্থও শতভাগ ব্যয় করা হয়, তাও বাকি থাকবে ২ হাজর ৮৮ কোটি টাকার বিশাল কাজ। নতুন সময়সীমা আগামী বছরের জুনের (অর্থবছরের) শেষ পর্যন্ত। হিসাব কোনোভাবেই মিলছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৭ সালে কাজ শেষ হওয়ার এই দাবি নেহাতই আইওয়াশ, মূলত নতুন করে বাজেট ও মেয়াদ বাড়ানোর পাঁয়তারা। 

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মোহাম্মদ খান টাইমস টুডেকে বলেন, প্রকল্পে দফায় দফায় মেয়াদ ও বাজেট বাড়ানোর প্রবণতা অপসংস্কৃতি ও লুটেরা মডেলে পরিণত হয়েছে। ঠিকাদারদের ঢিলেঢালা ভাব এবং ওয়াসা প্রশাসনের কঠোর তদারকি ও জবাবদিহির অভাবই বিপুল সরকারি অর্থ অপচয়ের মূল কারণ।

তিনি আরও বলেন, শতভাগ আর্থিক ছাড়ের কাছাকাছি পৌঁছেও যদি কাজের ২০ শতাংশ বাকি থাকে, বুঝতে হবে সুশাসনের ঘাটতি। জনগণের করের টাকা ও ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে, অথচ নাগরিকেরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. ওয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তবে ওয়াসার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পিডি বদল ছাড়াও  কারিগরি জটিলতা প্রাক্কলন মেয়াদ সংশোধন হয়েছে। এাবওে সংশোধিত মেয়াদে কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।  

উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকাবাসীর পানির চাহিদা  সামাল দিতে নদীর পানি শোধন করে দৈনিক ৫০০ এমএলডি সুপেয় পানি সরবরাহের এই বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।  বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর চরম গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতায় মেগাপ্রকল্পটির কাজ আটকে আছে ঝুলন্ত অবস্থায়।