...|...|...

বিশ্ব

৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণে ডুবে আছে বিশ্ব, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র; বাংলাদেশের অবস্থান কত?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩:৪৮
Shares
৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণে ডুবে আছে বিশ্ব, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র; বাংলাদেশের অবস্থান কত?

ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং বেহাল জনসেবার প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করছেন। এই ঋণের চাপে বর্তমানে ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে ফ্রান্সকে, যা ইউরোপীয় অর্থনীতিতে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র একটি ভিজ্যুয়াল এক্সপ্লেনারে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া, বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকা এবং ঋণের সুদের বিশাল অংকের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

ফ্রান্সের রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র বিক্ষোভ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত শনিবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ দেশজুড়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। ফ্রান্স ছাড়াও বেলজিয়াম, ইতালি এবং পর্তুগালের বিক্ষোভগুলো কোথাও শান্তিপূর্ণ থাকলেও কোথাও তা সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডে রূপ নিয়েছে।

বিক্ষোভের এই দাবানল এমন এক সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে যখন সরকারগুলো এক তীব্র আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। বছরের পর বছর ধরে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার ফলে ইউরোপের অনেক দেশ আজ ঋণের জালে বন্দী, আর সেই ঋণ পরিশোধের খরচ দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ২০০২ সালের পর থেকে ফ্রান্সে ঋণের খরচ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার যত বেশি সুদ পরিশোধের পেছনে ব্যয় করবে, প্রতিবাদী জনগণের দাবি অনুযায়ী স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের জন্য তাদের বাজেট ততটাই সংকুচিত হয়ে পড়বে।

সরকার কীভাবে ঋণ নেয়?

সাধারণ মানুষ যেভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, সরকারগুলো সেভাবে ঋণ নেয় না; বরং তারা বন্ড বিক্রির মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করে বন্ড ক্রেতাদের নির্দিষ্ট মেয়াদে সুদ পরিশোধ এবং মেয়াদ শেষে আসল টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। উদাহরণস্বরূপ— ১. সরকারের ঋণ গ্রহণ: একজন বিনিয়োগকারী ১০ বছর মেয়াদি একটি বন্ডের জন্য ১০০ ইউরো প্রদান করেন। ২. সুদ প্রদান: ১০ বছর ধরে প্রতি বছর বিনিয়োগকারী একটি নির্দিষ্ট হারে সুদ পান। যেমন—২.৫ শতাংশ হারে বছরে ২.৫ ইউরো (মোট ২৫ ইউরো) কিংবা ৫ শতাংশ হারে বছরে ৫ ইউরো (মোট ৫০ ইউরো)। ৩. ঋণ পরিশোধ: ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর বিনিয়োগকারী তার মূল ১০০ ইউরো ফেরত পান।

ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হলে কী ঘটে?

বন্ডের দাম কমে গেলে ফলন বা ইয়েল্ড বৃদ্ধি পায়, যার ফলে সরকারের ঋণ নেওয়া আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। অনেকটা বেশি হোম লোন বা গৃহঋণের সুদের মুখে পড়া কোনো পরিবারের মতো অবস্থাই তখন সরকারের হয়। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো অতি প্রয়োজনীয় খাতে খরচ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ সরকারের হাতে থাকে না।

ইউরোজোনের প্রধান অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি ঋণের খরচ ২০০০ সালের শুরুর পর আর কখনো ৫ শতাংশে পৌঁছায়নি। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণ সংকটের সময় কেবল গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো ধুঁকতে থাকা দেশগুলোই এই বা তার চেয়ে বেশি সুদ দিয়েছিল। আর ৭ শতাংশের বেশি সুদের হার আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে বেলআউট বা আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

বর্তমানে ফ্রান্সকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে, যেখানে জার্মানির ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩.৪১ শতাংশ। এই ব্যবধান স্পষ্ট করে দেয় যে বিনিয়োগকারীরা ফ্রান্সকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকি দেখছেন এবং উচ্চ রিটার্ন চাচ্ছেন। ইউরোজোন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বর্তমানে ফ্রান্স ইতালি ও গ্রিসের চেয়েও বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে। ইউরোজোনের বাইরে থাকা কেবল যুক্তরাজ্য এর চেয়ে বেশি সুদ দেয়।

কোন দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঋণগ্রস্ত?

যুক্তরাষ্ট্র: ৪১.৪ লাখ কোটি ডলার বা তাদের মোট জিডিপির ১২৭ শতাংশ ঋণ নিয়ে তালিকায় শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি বা মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার সুবিধা থাকায় বিশ্ববাজারে এর চাহিদা রয়েছে, তবে মার্কিন ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও অসীম নয়।

চীন: ২২.৫ লাখ কোটি ডলার বা জিডিপির ১০৪ শতাংশ ঋণ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

জাপান: ৮.৭ লাখ কোটি ডলার ঋণ নিয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ জিডিপির ১৯৯ শতাংশ ঋণ অনুপাত রয়েছে জাপানের।

যুক্তরাজ্য: ৪.৪ লাখ কোটি ডলার বা জিডিপির ১০২ শতাংশ ঋণ রয়েছে যুক্তরাজ্যের।

ফ্রান্স: ৪.২ লাখ কোটি ডলার বা জিডিপির ১১৮.৫ শতাংশ ঋণ নিয়ে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। ইতালির ৩.৭ লাখ কোটি ডলারের ঋণের অংক কম হলেও জিডিপির তুলনায় ইতালির ঋণ ১৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে জার্মানির ঋণের পরিমাণ ৩.৫ লাখ কোটি ডলার, যা তাদের জিডিপির মাত্র ৬৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ: ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার বা জিডিপির ৪০ শতাংশ ঋণ রয়েছে বাংলাদেশের। রাঙ্কিংএ ৪৫ তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ বেড়ে জিডিপির ১২১.৮ শতাংশে দাঁড়াতে পারে, যা দেশটির পাবলিক ফিন্যান্সকে টেকসই করার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলবে।

৩.৩ লাখ কোটি ডলারের বিশাল সুদের বিল

ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকার, গৃহস্থালি ও কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বৈশ্বিক ঋণ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ১০ লাখ কোটি ডলার বেড়ে ৩৬৫ লাখ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের হিসেবে প্রায় ৪৪,০০০ ডলার। এই বৃদ্ধির একটি বড় অংশ এসেছে উদীয়মান বাজারগুলো থেকে।

ঋণ পরিশোধের এই খরচ অত্যন্ত চড়া। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতিগুলো তাদের সরকারি বন্ডের বিপরীতে ৩.৩ লাখ কোটি ডলারের বেশি শুধু সুদ হিসেবে পরিশোধ করেছে। এই অঙ্ক বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় (৩.১ লাখ কোটি ডলার), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (২.৬ লাখ কোটি ডলার) কিংবা পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ব্যয়ের (২.৩ লাখ কোটি ডলার) চেয়েও বেশি।

সাধারণ মানুষের জন্য সুদের এই ক্রমবর্ধমান খরচের অর্থ হলো স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো জনসেবামূলক খাতে কম বরাদ্দ। এই বিল মেটাতে সরকারগুলোকে হয়তো কর বাড়াতে হবে নতুবা বাজেট কাটছাঁট করতে হবে। এছাড়া সরকারের উচ্চ ঋণ নেওয়ার খরচ সাধারণ মানুষের গৃহঋণ (মটগেজ), গাড়ি কেনা বা ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়িয়ে দিতে পারে।