...|...|...

বিশ্ব

পুনরায় চালু ডিভি লটারি, যোগ্যতার তালিকায় নেই বাংলাদেশ!

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:২২
Shares
পুনরায় চালু ডিভি লটারি, যোগ্যতার তালিকায় নেই বাংলাদেশ!

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখতে এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে বাধ্য করতে আদালতের আদেশে ২০২৭ সালের ডাইভারসিটি গ্রিন কার্ড লটারি (ডিভি লটারি) কর্মসূচি পুনরায় চালু হতে চলেছে। যেসব দেশ থেকে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে খুব বেশি অভিবাসী যায় না, সেই দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য এই লটারি কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ম্যাগাজিন ‘ফোর্বস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর মার্কিন জেলা জজ জিনসুক ওহতা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টকে বিলম্বিত ২০২৭ সালের ডাইভারসিটি ভিসা লটারি কর্মসূচি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই রায় একদিকে যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসনের সুযোগ রক্ষা করেছে, অন্যদিকে তেমনি নির্বাহী বিভাগ কংগ্রেসের আইন লঙ্ঘন করতে পারে না—এমন একটি সাংবিধানিক নীতিকেও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে।

লটারি চালুর পেছনের ইতিহাস ও কারণ

প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের স্বাক্ষরিত ১৯৯০ সালের অভিবাসন আইনের মাধ্যমে এই ডাইভারসিটি লটারি কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। মূলত পোস্ট-১৯৬৫ ব্যবস্থার আওতায় কিছু দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের সংখ্যার ভারসাম্যহীনতা দূর করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পারিবারিক বা কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রসেসিংয়ের বাইরে থেকে আসা সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ তৈরিই এর মূল লক্ষ্য ছিল। সময়ের সাথে সাথে এই কর্মসূচিতে আফ্রিকান উপভোক্তাদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

এই লটারির বরাদ্দকৃত কোটার মধ্যে মূল আবেদনকারীর স্ত্রী এবং সন্তানরাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। অর্থাৎ এর অর্থ এই নয় যে ৫৫ হাজার মূল আবেদনকারীর বাইরে তাদের পরিবার আলাদা কোটা পাবে। রক্তের সম্পর্ক বা নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল অভিবাসন ব্যবস্থা বারবার এমন লোকদেরই সুবিধা দেয়, যাদের ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব যোগাযোগ রয়েছে। সে কারণেই যাদের সেই সুবিধা নেই, তাদের পরিবারের জন্য আমেরিকায় প্রথম পদচিহ্ন স্থাপন করার একটি আলাদা সুযোগ তৈরি করে দেয় এই লটারি।

আইনি লড়াই ও প্রশাসনিক বিলম্ব

এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছিল যে এই কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে এবং সুবিধাজনক সময়ে নিবন্ধনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। তবে ২০২৭ সালের এই কর্মসূচির নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখায় কার্যত পুরো প্রোগ্রামটিই বাতিলের মুখে পড়েছিল। স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি কার্টিস মরিসনের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ‘রেড ঈগল ল’ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ জানায়।

বিচারক ওহতা এই যুক্তির সাথে একমত পোষণ করে একটি প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ওই আদেশে বলা হয়েছে, ডিপার্টমেন্টকে নিবন্ধনের বিবরণ ঘোষণা করতে হবে, ৩০ দিনের একটি রেজিস্ট্রেশন সময় দিতে হবে, নির্বাচিত আবেদনকারীদের বিজ্ঞপ্তি পাঠাতে হবে এবং প্রমিত মানদণ্ড অনুযায়ী তা প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধনের বিবরণ প্রকাশ, ১ নভেম্বরের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন শুরু এবং আগামী ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করার কথা। তবে ভিসা ইস্যু করার চূড়ান্ত সময়সীমা আগামী ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে, যদিও তাতে শেষ পর্যন্ত আদালতের রায় বদলাবে কি না তা নিশ্চিত নয়।

আইনের শাসন ও নিয়মকানুন

এই মামলার মূল বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার সাথে জড়িত। কারণ কংগ্রেস এই কর্মসূচি তৈরি করেছে, নির্বাহী বিভাগ তা পরিচালনা করে এবং আদালতগুলো পর্যালোচনা করে যে প্রশাসন আইন মেনে চলছে কি না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আইনগত পটভূমি থেকে আসলেও কোনো আইনি কর্মসূচিকে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে ঝুলিয়ে রাখা বা নিষ্ক্রিয় করে রাখা ভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি কোনো কর্মকর্তা শুধু আবেদন উইন্ডো বা সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে আইনকে নিষ্ক্রিয় করতে পারেন, তবে সেটি সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর বড় প্রশ্ন তুলবে।

শর্ত সাপেক্ষ সুযোগ ও সমালোচকদের যুক্তি

লটারিতে নির্বাচিত হওয়াই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, মূল আবেদনকারীদের অবশ্যই মানসম্মত উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষা বা যোগ্য কর্মঅভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে কোনো চাকরির অফার বা জব অফার থাকা বাধ্যতামূলক নয়। এছাড়া আবেদনকারীদের অবশ্যই অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা এবং পূর্ববর্তী অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের মতো শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।

সমালোচকদের মতে, এই ভিসার সুযোগগুলো মেধাবী কর্মী বা বিনিয়োগকারীদের দেওয়া উচিত। কারণ আমেরিকার মেধা ও পুঁজি প্রয়োজন। তবে দীর্ঘদিনের ইতিহাস বলে, সম্ভাবনার বিষয়টি সবসময় বিত্তবৈভবের ওপর নির্ভর করে না। ১৯৯০ সালের মূল আইনের অন্যতম রূপকার সাবেক প্রতিনিধি ব্রুস মরিসন যথাযথভাবেই বলেছেন, বিশ্বের প্রতিটি কোণ থেকে ‘স্ব-নির্বাচিত লড়াকু’দের আকৃষ্ট করার চেয়ে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আর কোনো ভালো প্রতিষেধক হতে পারে না। আদালত তাদের সেই সুযোগটি টিকিয়ে রেখেছে, এখন সরকারের কাজ হলো আইনসম্মত রেজিস্ট্রেশন ও দ্রুত প্রসেসিং নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ কি ডিভি লটারির যোগ্য?

নিবন্ধন শুরু হলেও বাংলাদেশিরা এতে আবেদন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ, ২০১২ সাল থেকে ডিভি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা নেই বাংলাদেশের। ফলে নতুন লটারি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলেও বাংলাদেশিদের আবেদনের সুযোগ মিলবে কি না, তা নির্ভর করছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার ওপর।

বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আসন্ন লটারিতে বাংলাদেশ যোগ্য দেশের তালিকায় থাকবে কি না। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশিদের আবেদনের সুযোগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি এ কর্মসূচির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করায় দেশটি এই তালিকার বাইরে চলে যায়।

বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে তাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, নতুন ডিভি লটারিতে দেশটি যোগ্যতার তালিকায় ফিরবে কি না। আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কিছু জানানো না হওয়া পর্যন্ত আবেদন করার সুযোগ নিশ্চিত নয়।