...|...|...

বিশ্ব

হিমালয়ে ‘মেগা-বিপর্যয়’ ঘটলে কি ডুববে বাংলাদেশ? যা বলছেন বিজ্ঞানীরা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, দুপুর ২:৩৯ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩:৫৫
Shares
হিমালয়ে ‘মেগা-বিপর্যয়’ ঘটলে কি ডুববে বাংলাদেশ? যা বলছেন বিজ্ঞানীরা

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের রসুয়া জেলায় লাংতাং লিরুং পর্বতমালায় সৃষ্ট সাম্প্রতিক হিমবাহ ধস  ও প্রলয়ংকরী হড়পা বান দক্ষিণ এশিয়ার জলবায়ু ঝুঁকিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ভূতাত্ত্বিক সংস্থা ইউএসজিএস-এর তথ্যমতে, বরফ ও পাথরের এই ধসটি এতটাই তীব্র ছিল যে তা বিশ্বজুড়ে সিসমোগ্রাফে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কম্পন তৈরি করেছিল।

যদিও বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র -এর বরাতে নিশ্চিত করেছে যে, ৫০০ কিলোমিটার ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এই সুনির্দিষ্ট দুর্যোগে বাংলাদেশের নদীগুলোর পানি বিপদসীমা পার হয়নি। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির বর্তমান হার দেখে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন—ভবিষ্যতে হিমালয় অঞ্চলে ঠিক কেমন রূপ নিলে এই পাহাড়ি ঢল ভাটির দেশ বাংলাদেশকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে মেগা-বন্যা ডেকে আনার মতো ৩টি প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ‘হিমবাহ হ্রদের চেইন রিঅ্যাকশন’ বা গ্লোফ

হিমালয় অঞ্চলে হাজার হাজার বরফগলা হ্রদ বা গ্ল্যাসিয়াল লেক রয়েছে। দি হিন্দুর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের এই বরফ-প্রাচীরগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।

নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে থাকা ৪৭টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদের মধ্যে যদি ৫ থেকে ১০টি বিশাল হ্রদ কোনো বড় ভূমিকম্প বা চরম তাপমাত্রার কারণে একযোগে বিস্ফোরিত হয়, তবে কোটি কোটি কিউসেক পানি একসাথে নদীগুলোতে নেমে আসবে।

এই বিপুল পানির স্রোত যখন নেপালের কোশী বা গণ্ডক নদী হয়ে ভারতের গঙ্গা এবং বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকায় প্রবেশ করবে, তখন তা সমভূমির স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জেলাগুলোকে নিমেষেই ডুবিয়ে দেবে।

২. উজানের মেগা-ব্যারেজ ও জলবিদ্যুৎ বাঁধগুলোর একযোগে ধস

নেপাল এবং ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন উপনদীতে শত শত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ফারাক্কা বা কোশী ব্যারেজের মতো পানি নিয়ন্ত্রণের বাঁধ রয়েছে।

গার্ডিয়ান গ্লোবের রিপোর্ট-এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে কীভাবে মেঘভাঙা বৃষ্টি বা বিশাল আকৃতির ভূমিধসের কারণে পাহাড়ি নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ হয়ে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়। ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো বিশাল কৃত্রিম হ্রদ ভেঙে যায়, তবে তা ডমিনো ইফেক্টের মতো লাইনের নিচে থাকা অন্যান্য বাঁধগুলোকে একযোগে ধসিয়ে দেবে।

বাঁধ ভাঙা এই পানির সুনামি যখন কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই বাংলাদেশের তিস্তা বা পদ্মা নদী দিয়ে প্রবেশ করবে, তখন নদী তীরবর্তী জেলাগুলো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১০ থেকে ১৫ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

৩. তিন নদী অববাহিকার একযোগে পানিবৃদ্ধি ও ‘ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট’

নেপালের পানি একা বাংলাদেশকে ডুবাতে পারে না, কারণ ভারতের বিশাল সমভূমি সেই পানি শুষে নেয়। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বরাতে ডেইলি স্টারে-এ দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তিন নদী ব্যবস্থার মোহনায়।

নেপালে হিমবাহ ধসের পানির সাথে সাথে যদি ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টি হয় (যা ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাকে স্ফীত করবে) এবং একই সময়ে বাংলাদেশের ভেতরেও অতিভারী মৌসুমী বৃষ্টিপাত সচল থাকে।

গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা—এই তিন নদী ব্যবস্থার পানি যখন একই সপ্তাহে বাংলাদেশের মোহনায় এসে মিলিত হবে এবং বঙ্গোপসাগরের তীব্র জোয়ারের কারণে সেই পানি সাগরে নামতে বাধা পাবে, তখনই তৈরি হবে ১৯৮৮ বা ১৯৯৮ সালের মতো ঐতিহাসিক মেগা-বন্যা। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা দীর্ঘ মেয়াদে জলমগ্ন থাকবে।

বিবিসির স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ এবং সিএনএনের বিশ্লেষণে ড্রোনে ধারণ করা ফুটেজে স্পষ্ট যে, প্রকৃতির এই রূপ পরিবর্তন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বর্তমানের নেপাল বন্যা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি হুমকি না হলেও এটি একটি বড় অশনিসংকেত। ভবিষ্যতে এমন মেগা বিপর্যয় থেকে বাঁচতে এখন থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ‘আঞ্চলিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা জরুরি।