...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

হাম সামলাতেই হিমশিম, ডেঙ্গুতে নতুন দুশ্চিন্তা

আল জুবায়ের বাদশা
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:০৪ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯:২৫
Shares
হাম সামলাতেই হিমশিম, ডেঙ্গুতে নতুন দুশ্চিন্তা

হামের ভয়াবহ প্রকোপে বিপর্যস্ত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু। কয়েক মাস ধরে হাম ও এর উপসর্গে হাজারের বেশি প্রাণহানির ক্ষত এখনও কাটেনি। এরই মধ্যে দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে মশাবাহিত রোগটির সংক্রমণ। আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্তের যে রেকর্ড তৈরি হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শুরুতেই তা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে হাম ও ডেঙ্গুর জোড়া আঘাতে দেশ এখন গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখে।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ শুরু হওয়া হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গের প্রাদুর্ভাব এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৯ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছিল ১০০ জনের; বাকি ৯০৯ জন মারা গেছেন রোগটির উপসর্গ নিয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায়ও হাম-সদৃশ উপসর্গে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে তিনজন এবং রাজশাহী, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে ২৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ১৬৫ জনের শরীরে রোগটির উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে দেশে হাম-সদৃশ উপসর্গ দেখা দেওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জনে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৩৩ জনের। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।

নতুন আতঙ্ক ডেঙ্গু

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ডেঙ্গু আক্রান্তদের সিংহভাগই তরুণ ও সম্ভাবনাময় বয়সের মানুষ। ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৬ হাজার ৯৯৮ জন এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৬ হাজার ৯৬৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সংক্রমণের শীর্ষে রয়েছেন। এ ছাড়া ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৬০৭ জন। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ১৩৯ জনের প্রাণহানি হয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৬ জন মারা গেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়। এরপর খুলনায় ২৫, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭, ময়মনসিংহে ১৪ এবং বরিশালে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিভাগীয় হিসাবে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৮৩৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন খুলনা বিভাগে, যা ঢাকার বাইরে সংক্রমণের ভয়াবহ বিস্তারের প্রমাণ দেয়। বর্তমানে সারা দেশের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩ হাজার ৪৩৪ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ২ হাজার ৮৯০ জনই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

গত বছরের তুলনায় চলতি বছর ডেঙ্গুর রূপ অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। গত বছর এই সময়ে যেখানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৯৬ জন, এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৪৩০ জনে, যার মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৪৪ হাজার ৮৫৭ জন। যদিও গত বছরের এই সময়ের সমান (১৩৯ জন) মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে, তবে আক্রান্তের এই লাগামহীন বৃদ্ধি সামনের দিনগুলোতে মৃত্যুঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাম ও ডেঙ্গু একসঙ্গে ছড়াতে থাকায় চিকিৎসাসেবা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শিগগিরই মাঠপর্যায়ে মশক নিধন ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার না করলে এ সংকট নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

মৃত্যু কমাতে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু দমনে স্রেফ ধরাবাঁধা ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া দেওয়ার পুরোনো কৌশল কাজ করছে না। ডেঙ্গু রুখতে দরকার বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে লার্ভা বিনাশের পরিকল্পিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ, যার স্পষ্ট অভাব রয়েছে। তাছাড়া উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকায় আটকে নেই, খুব দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশের জেলা শহরগুলোতে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এবং লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও চিকিৎসা নিতে দেরি করা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন টাইমস টুডেকে বলেন, টিকা দিলেই যে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু থেমে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। টিকা দেওয়ার প্রায় এক মাস পর থেকে হামের সংক্রমণ কমতে শুরু করে, তাই টিকা কেবল প্রতিরোধের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। মূলত মৃত্যু কমাতে হলে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজাতে হবে। রোগীকে শেষ মুহূর্তে আইসিইউ পর্যন্ত পৌঁছাতে না দিয়ে শুরুতেই, অর্থাৎ কমিউনিটি পর্যায় থেকে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে।

তিনি বলেন, জ্বর বা লক্ষণ দেখা দেওয়ার প্রথম দিন থেকেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে পারলে রোগীর অবস্থা আর জটিল হবে না। এতে করে আইসিইউ ও বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমার পাশাপাশি মৃত্যুহারও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

দেশজুড়ে নতুন ক্যাম্পেইন

এদিকে গতকাল এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার কোনো টিকা মজুত রেখে না যাওয়ায় শুরুতে হামের প্রকোপ মোকাবিলায় কিছুটা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক কোটির বেশি টিকা সংগ্রহ করে ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, এখনও যেসব শিশু টিকার আওতায় আসেনি, তাদের জন্য ইউনিসেফের মাধ্যমে নতুন টিকা এসেছে। এসব টিকা ব্যবহার করে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে পুনরায় বড় পরিসরে হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হবে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, বাসাবাড়িতে ফুলের টবসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলে সেখানে মশার লার্ভা জন্ম নেয়। এ কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও মফস্বল এলাকাতেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ডেঙ্গু এখন দীর্ঘমেয়াদি সংকট

ডেঙ্গু এখন আর কেবল সাময়িক কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি মারাত্মক সংকটে পরিণত হয়েছে বলে সতর্ক করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের এই পিক মৌসুমে সংক্রমণ ও প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই কীটতত্ত্ববিদ জানান, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোম’, রোগীদের দেরিতে হাসপাতালে আসা এবং জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব। তবে এই সংকট কাটাতে কেবল হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা বাড়ানোই শেষ কথা নয়। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, ঝুঁকিপূর্ণ রোগীকে সময়মতো সঠিক হাসপাতালে রেফার করা এবং স্বজনদের সচেতনতাই পারে প্রাণহানি কমাতে।

ডেঙ্গুর ভয়াবহ অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে তিনি জানান, ঢাকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রতি রোগীর চিকিৎসায় পরিবার ও সমাজের গড়ে প্রায় ৪৭৯ মার্কিন ডলার (প্রায় সাড়ে ৫৭ হাজার টাকা) ব্যয় হয়। ফলে একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু বা অসুস্থতা পুরো পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিচ্ছে।

মশা নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ব্যর্থতা নিয়ে অধ্যাপক বাশার বলেন, রাস্তাঘাটে ফগিং করে পূর্ণবয়স্ক মশা মারার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাই আমাদের মূল ভুল। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত দুই বছরের এক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ এডিস মশার প্রজনন ঘটে মানুষের বসতবাড়ি ও তার আশপাশে। পানির ড্রাম, ট্যাংকি, মেঝের জমা পানি, বেজমেন্ট ও বালতির মতো পাত্রে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি করছে। ফলে ঘরের ভেতরের এই প্রজননস্থল ধ্বংস না করে কেবল বাইরের ফগিং দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। ডেঙ্গু এখন আর কেবল ঢাকা শহর কেন্দ্রিক নয়, দেশের বহু জেলাতেই এটি ছড়িয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানান তিনি। 

কেবল হাসপাতাল প্রস্তুত না রেখে নিয়মিত কীটতাত্ত্বিক সমীক্ষা, মশার ওষুধ বা কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই এবং প্রজননস্থলভিত্তিক ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি কার্যকর ও তথ্যনির্ভর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানান এই গবেষক।